পৌষের শেষ থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। এর মধ্যে বাড়তি বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এই বৃষ্টির মধ্যে অন্তত ১০ জেলায় বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। শীতের এমন প্রকোপ আরও কয়েক দিন থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
তীব্র শীতের মধ্যে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে স্কুল বন্ধের নির্দেশনা নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে স্থানীয় স্কুলগুলো। কোথাও কোথাও খোলা রেখেছে স্কুল কর্র্তৃপক্ষ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দিয়েছে নির্দেশনা অনুযায়ী তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে স্কুল বন্ধ দিতে হবে।
তবে এ নির্দেশনার বিষয়ে স্পষ্ট নন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা। কারও কারও ধারণা, স্কুল খোলার পর তাপমাত্রা যদি ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়, তাহলে স্কুল বন্ধ হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের নির্দেশনা না পাওয়ায় স্কুল খোলা রয়েছে। কেউ বলছেন, সমন্বয়হীনতার কারণে স্কুল বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরের বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সাত দিন ধরে নিকলীর তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে আবস্থান করছিল। আবহাওয়ার যখন এমন অবস্থা, তখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না দেওয়ার বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া আক্তার জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০ ডিগ্রি নিচে ছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, যার কারণে বন্ধ ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
একই অবস্থা উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার তেঁতুলিয়া পর্যবেক্ষণাগারের রিপোর্ট অনুযায়ী, সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন তীব্র শীতের মধ্যে সকাল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়।
এমতাবস্থায় জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শুধু শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুজ জামান। তিনি গতকাল সকালে এই চিঠি ইস্যু করেন। এই চিঠির খবর বিদ্যালয়গুলোতে পৌঁছায় বেলা ১১টায়। এ বিষয়ে জেলার শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, সকাল ৯টায় স্কুল বন্ধের নির্দেশনা পাওয়ার পর চিঠি ইস্যু করতে এবং পাঠাতে আসলে বেলা ১১টা বেজে যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে এত দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই চিঠির ঘোষণা বিদ্যালয়গুলোতে পৌঁছানোর আগেই অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে চলে আসে।
গত কয়েক দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে রংপুরের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসেছে। এ কারণে শিক্ষা অধিদপ্তর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে। তবে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন হয়নি রংপুরের স্কুলগুলোতে। এসব স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, তারা জেলা শিক্ষা অফিসের কোনো নির্দেশনা পাননি। এ কারণে স্কুল খোলা ছিল।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস রংপুরের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও কুড়িগ্রামে শৈত্যপ্রবাহ ও তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকা স্কুল বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে রংপুরের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকায় বিদ্যালয়গুলোতে বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।
উত্তরের আরেক জেলা নওগাঁয় ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও স্কুল-কলেজ খোলা ছিল। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। আগামী দু-এক দিন ১০ ডিগ্রির নিচে থাকলে স্কুলে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার ব্যাবস্থ নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি সব স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তাপমাত্রা বাড়ার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নীলফামারীতে তাপমাত্রা ৮ দশমিক ২ ডিগ্রির নিচে নামলেও স্কুল খোলা ছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা স্কুল বন্ধের কোনো নির্দেশনা পাননি। তাই তাদের স্কুল চালু রেখেছেন।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা খোঁজ রাখছি এবং প্রতিদিন রিপোর্ট দিতে হচ্ছে কত ডিগ্রি পর্যন্ত আছে। গত বুধবার রাত পর্যন্ত ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস সংগ্রহ করেছি। যেহেতু জেলা শহরে কোনো আবহাওয়া অফিস নেই, আছে সৈয়দপুর ও ডিমলায়, সেজন্য আমরা মোবাইল অ্যাপসে তাপমাত্রা দেখি। আজকে আবহাওয়া ভালো আছে, এজন্য সব স্কুল খোলা রয়েছে।’
একই অবস্থা উত্তরের জেলা দিনাজপুরে। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেও অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান হয়েছে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নির্দেশনা নেই।
দিনাজপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম অধিকাংশ স্কুল খোলা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বুধবার তাপমাত্রা বেশি ছিল, কিন্তু গতকাল তাপমাত্রা কমে গেছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পাঠদান চলমান রাখা হয়েছে। যদি রবিবার পর্যন্ত তাপমাত্রা না বাড়ে, তাহলে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি-২-এর সহকারী পরিচালক এস এম জিয়াউল হায়দার হেনরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের যেকোনো জেলায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল বন্ধ রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, দু-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত কমে আসবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হওয়ার ফলে কুয়াশা কাটতে শুরু করবে। তবে শীতের তীব্রতা এখনই কমছে না। চলতি মাসেও এটা অব্যাহত থাকবে। তবে দিনের তাপমাত্রা বাড়লেও রাতে শীতের অনুভূতি থাকবে।
তাপমাত্রার সঠিক তথ্য নিয়ে জেলাপর্যায়ে বিভ্রান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কত সেই হিসাব ধরে আবহাওয়া পর্যালোচনা করে থাকি আমরা। এ নিয়ে জেলাপর্যায়ে কিছুটা বিভ্রান্তি হয়তো হয়েছে। তারা যদি স্থানীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে এটা সমাধান হয়ে যাবে। অথবা আমরা যে ওয়েবসাইটে পূর্বাভাস দিয়ে থাকি, সেটি দেখলেও এই বিভ্রান্তি থাকবে না।’