হাসপাতালপাড়ায় রমরমা আবাসিক হেটেল ব্যবসা

ঢাকার বাইরে থেকে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের রাতে থাকার বড় সংকট। এর মধ্যে যদি চিকিৎসক বলেন যে কিছু পরীক্ষা করে দুদিন পর আবার আসবেন। তখন যেন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বাড়ি ফিরে আবার স্বল্প সময়ে ঢাকায় আসা তাদের জন্য কঠিন। কিন্তু এখন সে সমস্যা অনেকটাই কম। কারণ ঢাকার হাসপাতালপাড়া নামে খ্যাত পান্থপথ, গ্রীন রোড ও ধানমন্ডি এলাকায় হাসপাতালকেন্দ্রিক অনেক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ গড়ে উঠেছে।

বিভিন্ন সময়ে খবরে বা মানুষের মুখে শুনতে পাওয়া যায়, বাংলাদেশ থেকে বেশি লোক ভারতের কলকাতায় বা চেন্নাই যায় চিকিৎসার জন্য। সেখানে এই রোগী ও তাদের স্বজনদের থাকার জায়গা প্রয়োজন হয়। আর এটা থেকে ব্যবসার কথা মাথায় রেখে ওই হাসপাতালগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজসহ নানা আবাসিক ব্যবস্থা। ঠিক সেরকম বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল বা গ্রাম থেকে ঢাকায় চিকিৎসা করতে আসা মানুষের থাকার জায়গা ও নিয়মের শিথিলতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসার চিন্তা থেকে হাসপাতালকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে এধরনের আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ।

ব্যবসায় জড়িত ও হোটেল বোর্ডাররা বলছেন, আমরা যখন দেশের বাইরে কোথাও চিকিৎসা করার কথা ভাবি। তখন চিন্তা করি হাসপাতালের আশপাশ এলাকায় কোনো থাকার জায়গা পাওয়া যায় কি-না। ভারতের চেন্নাই বা কলকাতায় অ্যাপোলো বা অন্য হাসপাতালে অথবা থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বুমরুনগ্রাদ হাসপাতালে যারা চিকিৎসা করাতে যান, তারাও এধরনের চিন্তা করেন। আর সেখানে দেখা যায় এধরনের হাসপাতাল ঘিরে গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ।

তারা আরও বলেন, ভালো ডাক্তার দেখানো, রোগ নির্ণয় এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসার পাশাপাশি আরোগ্য লাভের হার বিবেচনায় ব্যয়বহুল হলেও বাংলাদেশের গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিনই বহু রোগী আসে ঢাকায়। রাজধানীর গ্রীন রোড, পান্থপথ ও ধানমন্ডি ঘিরে স্কয়ার, সমরিতা, বিআরবি, গ্রীন লাইফ, ল্যাব এইড, আনোয়ার খান মডার্ন, পপুলার হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি বড় হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের থাকার কথা চিন্তা করে ছোট-বড় হোটেলও গড়ে উঠেছে।

হোটেল ব্যবসায় জড়িত লোকজন বলছে, পান্থপথ ও গ্রীনরোডে ছোট বড় মিলে প্রায় শতাধিক আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। শনিবার দিনভর পান্থপথ ও গ্রীন রোডের সড়কে ও অলিগলিতে ঘুরে এর প্রমাণও মেলে।

এ প্রতিবেদক অন্তত ১০টি হোটেল ও গেস্ট হাউজে ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। ব্যবসায় জড়িতরা বলেন, এখানে আগে এত হোটেল ছিল না। গত ৩-৪ বছরে অনেক হোটেল গড়ে উঠেছে। 

পান্থপথের পশ্চিম রাজাবাজারে একটি হোটেলে কথা হয় গাইবান্ধার সাঘাটা থেকে আসা রহিমা বানুর সঙ্গে। তিনি বলেন, তার ছেলের বেশ কয়েকদিন অসুস্থ থাকায় ঢাকায় আসতে বলে চিকিৎসক। তাই ছেলেকে নিয়ে পান্থপথে বিআরবি হসপিটালসে ডাক্তার দেখিয়েছেন। হোটেলে ওঠার বিষয়ে বলেন, তার স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন। থাকেন মেসে। আর যে আত্মীয় আছে তারাও থাকেন কষ্টে। থাকব কোথায়? তাই হোটেলে উঠেছি। তিনি বলেন, 'এখন একটা কথা খুব চলে। ঢাকায় গেলে আপনারে দুই বেলা খাওয়াতে পারমু। কিন্তু থাকার জায়গার অভাব। এখানে এসে দেখলাম। ঘটনা সত্য।' তিনি বলেন, 'আবার অনেকে বিরক্ত হয় বাসায় থাকলে। তাই আর কাউরে বিরক্ত করি না। এই হোটেল না থাকলে আমাদের মতো লোক কই যাইত এটাই চিন্তা করি।'

শুধু রহিমা নন, তার মতো অনেকেই এখন গ্রাম থেকে ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে আসলে আবাসিক হোটেলগুলোতে থাকছেন।

পান্থপথের পশ্চিম রাজাবাজারে অবস্থিত অ্যাকটিভ ফ্যামিলি গেস্ট হাউজের চেয়ারম্যান মো. আমির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার এখানে ৩০টা রুম রয়েছে। ভাড়া ১২০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা। হাসপাতালের রোগীর লোক বেশি। তবে অন্য লোকও আসেন। অনেকে বাইরের খাবার খেতে পারেন না। তাই তার এখানে লোকজন নিজে রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।

ব্যবসা বা অন্য বিষয়ে তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ডিসি অফিসের অনুমতি, হেল্থ সার্টিফিকেট, ফায়ার সার্ভিস সার্টিফিকেটসহ কয়েকটি কাগজপত্র লাগে হোটেল চালু করার জন্য। এসব নিয়ম মেনে ব্যবসা করা অনেক কঠিন। যে কারণে আমরা কম টাকায় একটা রুম ভাড়া দিতে পারি না। অভিযোগের সুরে আমির বলেন, এখানে বেশির ভাগ হোটেলের কোনো অনুমোদন নেই। তারা ১০-১২টা রুম করে হোটেল বলে ব্যবসা করছেন। তারা ৫০০ টাকায় রুম ভাড়া দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। কারণ তাদের খরচ কম।

পশ্চিম পান্থপথে অবস্থিত হোটেল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল আবাসিকের ম্যানেজার স্বপন বণিক বলেন, গত ১০ বছর ধরে তারা এখানে হোটেল চালাচ্ছেন। তাদের ১১টা রুম রয়েছে, যার ভাড়া ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। করোনা ও ইলেকশন টাইমে তাদের ব্যবসা ভালো ছিল না। বছরে গড়ে ৪০-৫০ শতাংশ রুমে বোর্ডার পান তারা। আর এর মধ্যে আবার প্রায় ৯০ শতাংশই রোগী বা তার স্বজনরাই তাদের বোর্ডার। তিনি বলেন, এই গ্রীন রোড ও পান্থপথে হাসপাতালকেন্দ্রিক আবাসিক হোটেল আছে প্রায় শতাধিকের কাছাকাছি।

প্রায় একই রকম জবাব দেন উত্তর পান্থপথে ১০টি কক্ষবিশিষ্ট হোটেল রোজ হ্যাভেনের ম্যানেজার মোহাম্মদ রানা। তিনি বলেন, তিন মাস ধরে এই হোটেলটি চালু করেছেন। তাদের বোর্ডার সাধারণত হাসপাতালকেন্দ্রিক। তিন মাসে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রুমে বোর্ডার ছিল।

তারা দুজনই তাদের অনুমতি রয়েছে দাবি করে বলেন, তাদের ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন নম্বর আছে। অন্য কাগজ সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেনি। তবে তারা সব নিয়ম মেনে রুম ভাড়া দেন বলে দাবি করেন।

এই এলাকায় ব্যবসায় জড়িতরা বলেন, সারা বছরের ব্যবসা হিসেব করলে তাদের আসলে ব্যবসা ভালো না। তবে তারা খরচ দিয়ে কোনোরকম টিকে আছেন।