দীর্ঘ দেড় বছর পর বেশিরভাগ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস বা মূল্যস্তর উঠে যাওয়ার প্রথম দিনের লেনদেন পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা ছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউজগুলোর সতর্কতামূলক পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত বড় পতন এড়ানো গেছে। গতকাল লেনদেনের শুরুতে বড় পতন দেখা দিলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো গেছে। দিনশেষে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৯৬ পয়েন্ট, যা লেনদেনের শুরুতে ২১৪ পয়েন্ট পর্যন্ত কমেছিল।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল ৩৫টি ছাড়া অবশিষ্ট কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট ফ্লোর প্রাইস ছাড়াই লেনদেন শুরু করে। এসব শেয়ারের জন্য স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হয়। লেনদেন শুরুর ৭ মিনিটের মধ্যে লেনদেন হওয়া বেশিরভাগ শেয়ারের বড় দরপতনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সূচক ২১৪ পয়েন্ট কমে ৬১২২ পয়েন্টে নেমে আসে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসইসি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পদক্ষেপে হারানো মূল্যসূচক পুনরুদ্ধার হতে দেখা যায়। এরপরও দিন শেষে বড় পতন দিয়েই লেনদেন শেষ হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল ডিএসইতে ৩৮৬টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের মধ্যে দর কমেছে ২৯৫টির। বিপরীতে দর বেড়েছে ৫৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৬টির। গতকাল ১৬ কোম্পানির শেয়ারের দর ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর মধ্যে ৯ থেকে ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ কমেছে ১১৬টি কোম্পানির শেয়ার।
এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ঘিরে দরপতনের যে শঙ্কা আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমন করতে এসইসি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিছুদিন আগেই ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে সিএমএসএমই ফান্ড থেকে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ে। ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ অন্যান্য বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সাপোর্ট দেওয়ার আশ^াস দিয়েছে। গত দেড় বছরে বেশ কিছু মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা রয়েছে। মোদ্দা কথা, সবাইকে মোটিভেটেড করা হয়েছে। এর বাইরে আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি, যাতে কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে দরপতন ঘটাতে না পারে।’
এদিকে গতকাল এসইসির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে বড় ব্রোকারেজ হাউজগুলোও দরপতন রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। লেনদেন শুরুর আগেই শীর্ষ ব্রোকাজের হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন সিইও ফোরাম অনলাইন সভায় ডিলার হিসেবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিনিয়োগকারীদের বোঝানোর পাশাপাশি যেসব শেয়ারের ক্রেতা থাকবে না, সেখানে বিক্রির আদেশ বসানো হবে না বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ট্রেডারদের এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হবে। শুধু ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের কারণে যাতে বিনিয়োগকারীরা যাতে আতঙ্কিত না হন, বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি না হয়, সেদিকে সবাই খেয়াল রাখবেন। গতকাল সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। গতকাল এ খাতের বাজার মূলধন কমেছে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। খেলাপি ও তারল্য সংকটে থাকা এ খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির আয় কমে গেছে। গতকাল ডিএসইতে এ খাতের ২০ কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি দর হারিয়েছে। এ খাতের বেশিরভাগ শেয়ারের দরই ৯ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
দরপতনের পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো। গতকাল এ খাতের ৫৬টি শেয়ারের লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ৫২টির দরই কমেছে। তীব্র বিক্রিচাপে এ খাতটির বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। দেশে চলমান ডলার ও জ্বালানি সংকটে যেসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম বস্ত্র। জ¦ালানি স্বল্পতার কারণে এ খাতের বেশিরভাগ কোম্পানিই এখন পূর্ণ উৎপাদনে নেই। গতকাল এ খাতের বেশিরভাগ শেয়ার গতকাল ৮ থেকে ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে। প্রায় একই হারে বাজার মূলধন হারিয়েছে সিরামিক খাত। এ খাতের চার কোম্পানিই গতকাল দর হারিয়েছে। বাজার মূলধন কমেছে ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ।
সূচকে প্রভাব না থাকলেও মিউচুয়াল ফান্ডের দরপতন ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকাল লেনদেন হওয়া ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর কমেছে ৩৪টির। সম্মিলিতভাবে খাতটি বাজার মূলধন হারিয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। করপোরেট বন্ড হারিয়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ দর।
সূচকে প্রভাব বিস্তার করা খাতের মধ্যে প্রকৌশল খাত ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, ব্যাংক ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ দর হারিয়েছে। এর বাইরে বীমা খাত ২ দশমিক ৭৭, জ্বালানি ২ দশমিক ৩৩, ট্যানারি ৩ দশমিক ৭, তথ্যপ্রযুক্তি ১ দশমিক ৯২ ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের ১ দশমিক ৩২ শতাংশ বাজার মূলধন হারানো ছিল উল্লেখযোগ্য।