সরকারি প্রকল্পগুলোয় বাস্তবায়ন দুর্বলতার কারণে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) খাতভিত্তিক বরাদ্দের যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবহার করতে না পারায় তা ফেরত যাচ্ছে। অদক্ষ প্রকল্প পরিচালকদের কারণে সময় ও ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এডিপিতে বড় সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আজ বুধবার পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটির জরুরি সভা রয়েছে। দেশের ইতিহাসে এ ধরনের সভা চতুর্থ ঘটনা। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতা গ্রহণের পর এ ধরনের একটি সভা হয়েছিল, দ্বিতীয় সভাটি হয়েছিল এরশাদ সরকারের সময়, তৃতীয় সভা হয় ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বেই।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এডিপিতে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সুরক্ষায় যে বরাদ্দ রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে অনেক কম রাখা হয়েছে। ফলে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এডিপি বরাদ্দের সঙ্গে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সামঞ্জস্য থাকলে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সহজ হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন থেকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ীই এডিপির বরাদ্দ রাখা হবে; যাতে দেশের অর্থনীতির চলমান ধারা ঠিক থাকে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করা হয় একটা কৌশলগত গাইডলাইন হিসেবে। সরকার প্রতি বছর বাজেটে যে কর্মসূচি বা বিনিয়োগ পরিকল্পনা দেবে, সেটি তারা কিসের ভিত্তিতে করবে, এর নির্দেশনা ও পরামর্শ থাকে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মিল রাখতে গেলে মাঝখানে একটি বাহনের প্রয়োজন। ধরুন, ২০২৪ থেকে ২০২৯ পর্যন্ত একটি পরিকল্পনা করা হলো, বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হলো, কিন্তু তার সঙ্গে যদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা না হয়, কোন খাতে কত বিনিয়োগ হবে, অর্থাৎ কৌশলগত পরিকল্পনার পরিপূরক হিসেবে একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনাও থাকে। বিনিয়োগের পরিকল্পনাটা ঠিকমতো হয় না।
ড. জাহিদ বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে তিন বছরমেয়াদি পরিকল্পনা হতো। পরে দেখা গেল সেটাকে কেউ আমলে নিচ্ছে না। তারা মনে করতেন, এটি করে আসলে সময় নষ্ট করা। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ হলো একটি রোলিং বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা হোক। তাহলে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এডিপির লিংক পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আজকের সভায় পরিকল্পনা কমিশন কী কী বিষয় উপস্থাপন করবে এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধান আলোচ্য বিষয় থাকবে দেশের সংকটময় অর্থনীতির পর্যালোচনা; বিশেষ করে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আরও বেশি কীভাবে আনা যায়, আর কোনো মেগা প্রকল্প নেওয়া বা না নেওয়ার পরামর্শ। তা ছাড়া এডিপি বরাদ্দের সঙ্গে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মিল না থাকা, সরকারি প্রকল্পে ‘প্রকল্প পরিচালক পুল’ গঠন, মন্ত্রণালয়গুলো প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নতুন কিছু সিদ্ধান্ত আসবে।
বিদেশি ঋণ ব্যবহারে আসবে নির্দেশনা
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যয়ে সরকারি অংশ এবং বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অনুপাত পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি খাতের ব্যয় এবং বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অনুপাত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৬০:৪০, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৫:৩৫-এ দাঁড়িয়েছে; অর্থাৎ ১৫ বছরে আনুপাতিক হারে প্রকল্পে বিদেশি ঋণের অংশ কমেছে।
এডিপিতে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের বরাদ্দ এবং প্রকৃত ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে মূল বরাদ্দের ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ ও অনুদান ব্যবহারের হার ছিল ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যবহারের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ শতাংশ পার্থক্য রয়েছে।
কমিশন মনে করে, যেসব প্রকল্পে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের সম্পৃক্ততা আছে, সেই সব প্রকল্প যথাসময়ে শেষ করার স্বার্থে বাস্তবায়ন অগ্রগতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বাইরে এডিপি বরাদ্দ নয়
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, আজ প্রধানমন্ত্রীর সামনে পঞ্চবার্ষিকীর পরিকল্পনার সঙ্গে এডিপির মিল না থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে কমিশন। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ, কিন্তু এই অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ, কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ ছিল ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, প্রকৃত বরাদ্দ ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বরাদ্দের কথা ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ, প্রকৃত বরাদ্দ ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, স্থানীয় সরকারে বরাদ্দের কথা ১২ দশমিক ১ শতাংশ, প্রকৃত বরাদ্দ ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ, সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দের কথা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, প্রকৃত বরাদ্দ ১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলোতে বরাদ্দ কমিয়ে অন্য খাতে চলতি এডিপিতে বেশি বরাদ্দ রয়েছে। যেমন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পরামর্শ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে বরাদ্দ রাখার কথা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, চলতি এডিপিতে তা ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ রাখার কথা ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ, চলতি এডিপিতে প্রকৃত বরাদ্দ ২৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ, গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ বরাদ্দের পরামর্শ থাকলেও এখন তা ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ খাতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের প্রক্ষেপণ থাকলেও প্রকৃত বরাদ্দ ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।
তারা বলছেন, যেসব খাতে এসব বরাদ্দের অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, সেই সব খাতে যাতে সংগতি রেখে এডিপি বরাদ্দ হয় এ ধরনের নির্দেশনা আসতে পারে আজকের সভা থেকে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা না হলে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তার জায়গাতেই থেকে যায়, বার্ষিক পরিকল্পনা আগের মতোই চলতে থাকে। পঞ্চবার্ষিকীর সঙ্গে যদি সামঞ্জস্য থাকে তাহলে প্রকল্প নির্বাচনে বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
আসতে পারে ‘প্রকল্প বাছাই কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত
কমিশন সূত্র বলছে, সভায় প্রকল্প বাছাই কমিটি গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় থাকবে। নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এডিপি বা সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন পর্যন্ত অনেক ধাপ আছে। বিদ্যমান পদ্ধতিতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তিতে শুধু কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ সম্পৃক্ত থাকায় বিপুলসংখ্যক প্রকল্প থেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাছাইয়ের কাজটি সুচারুভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে কমিশনের সব সদস্যের সমন্বয়ে কার্যক্রম বিভাগের সদস্যের সভাপতিত্বে ‘প্রকল্প বাছাই কমিটি’ গঠন করা হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতি রেখে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্বাচন করা সহজতর হবে।
অদক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নয়
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি পরিহার এবং উন্নয়ন প্রকল্প সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ অত্যাবশ্যক। বিদ্যমান পরিপত্রে ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে এবং একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রকল্পে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং ব্যয় বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা আসতে পারে আজ। যেমন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অভিজ্ঞ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ‘প্রকল্প পরিচালক পুল’ গঠন করা যেতে পারে। একজন কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পে নিয়োগ না করার নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের অনুশাসন দেওয়া হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রকল্প ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব না দেওয়ার নির্দেশনা আসতে পারে। এ দুটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প আরও বেশি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের অগ্রগতি
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০৩০ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রারম্ভিক কাজ শুরু করেছে। এর সামষ্টিক কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য সামনে রেখে নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া ধারণাপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে।