আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তাই বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় সুশাসন নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদের স্বতন্ত্র পরিচালকদের চেয়ারম্যান করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান।
গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজসভায় এসব কথা বলেন আতিউর রহমান। এফআইসিসিআই সভাপতি ও ইউনিলিভার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাভেদ আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আতিউর রহমান বলেন, পেশাজীবীদের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়ে আসা উচিত। পাশাপাশি মানুষ যেন স্বেচ্ছায় ঋণখেলাপি না হয়, তা নিশ্চিত করতে নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইন বাস্তবায়ন ও দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণে উৎসাহ দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
ভোজসভায় ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আতিউর রহমান। তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মূল মালিক হিসেবে যাঁদের বলা হয়, তারা মূল মালিক নন; বরং ব্যাংকের আমানতকারীরা মূল মালিক। সুতরাং স্বতন্ত্র পরিচালকরা চেয়ারম্যান হলে তারা হবেন ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের প্রতিনিধি।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে উল্লেখ করে আতিউর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধির গতি যদি ৫ শতাংশ থাকে, তাহলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ, যেমন মূল্যস্ফীতি, আর্থিক হিসাবের ঘাটতি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ইত্যাদি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রথম কাজ হবে বিনিময় হার স্থিতিশীল করা। এতে মূল্যস্ফীতি কমবে, পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।
আতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সামনে অনেক দূর যেতে হবে। এটা সম্ভব হবে যদি আমাদের অর্থনীতিকে আরও সবুজ করি, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করি এবং আমাদের মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় করি, যদি ভরসার পরিবেশ তৈরি করতে পারি।’ তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি কাজ। এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈদেশিক বিনিয়োগ।
‘বাংলাদেশের পরিশ্রমী মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তারা অনেক আশায় বুক বেঁধে বসে আছে। তারা নতুন সময়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। এ ভরসা যদি আমরা দিতে পারি তাহলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ জোর কদমে এগিয়ে যাবে। ২০৪০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে।’
আতিউর রহমান বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নের পেছনে কাজ করে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক-সামাজিক রীতি পদ্ধতি। আগামীতে উৎপাদনের ওপর জোর দিতে হবে। আমাদের অর্থনীতির তিন ভিত্তির অন্যতম রপ্তানিকে তৈরি পোশাকের অবস্থান ধরে রেখে রপ্তানি বহুমুখী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকনির্ভরতা কাটিয়ে দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠানো, কৃষিকে যন্ত্রায়নের চলমান ধারাকে অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও গতিশীল করতে হবে। একই সময়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতা নিশ্চিত করতে হবে।’
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়ে আতিউর রহমান বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য মানবসম্পদের উন্নতি করতে হবে। এ জন্য বিনিযোগ বাড়াতে হবে। উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতি এবং জলবায়ুবান্ধব বিনিয়োগে মনোযোগ দিতে হবে।
জাভেদ আখতার বলেন, ‘বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা মন্দার কাছে দমে যাইনি, উদ্বিগ্নও নই। মন্দাকে মোকাবিলা করেই আমরা আমাদের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চাই। অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সুযোগগুলো কাজে লাগানোর মধ্যেই আমাদের পথনকশা তৈরি করে এগোতে হবে। আমরা সেভাবেই এগোচ্ছি। আগামীতে এ যাত্রা আরও গতিময় হবে, যা দেশকে সঠিক অর্থনৈতিক গতিপথে ফিরিয়ে আনতে আমাদের সেরা পদক্ষেপটি রচিত হবে।’
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফিকির নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবির। অনুষ্ঠানে দেশে বিনিয়োগকারীর বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তারা ছিলেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।