নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক থাকার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড মানসম্পন্ন করতে হলে প্রকল্পগুলোও মানসম্পন্ন উপায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। গুণগত মানসম্পন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০ কোটি টাকার বেশি যেকোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা) পরিচালনার ওপর আরও জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার ৯ বছর পর পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। তিনি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে অহেতুক একটা প্রস্তাব এলো বড় আকারের, সেটা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ না করে প্রতিটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে এটাই মাথায় রাখতে হবে সেখানে আমাদের কী পরিমাণ টাকা ব্যয় হবে, আমরা কী পরিমাণ ঋণ নিচ্ছি এবং সুদসহ কী পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সেটা করার মতো আমাদের সক্ষমতা আছে কি না। এসব যাচাই-বাছাই করা একান্তভাবে দরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন কোনো উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা হাতে নিই, সে সময় খেয়াল রাখতে হবে কোনটা আমার দেশের জন্য প্রযোজ্য এবং প্রয়োজন। অনেক সময় প্রকল্প পরিচালনার জন্য আমরা এডিবি বা বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য সংস্থা বা দেশ থেকে ঋণ নিয়ে কাজ করি। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক বড় অঙ্কের টাকার প্রকল্প নিয়ে আসা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অযথা টাকা ধার করা নয়, কারণ তা সুদসহ আমাকেই পরিশোধ করতে হয়। তাই এই বোঝা যাতে আমাদের কাঁধে না পড়ে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।’

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুস সালাম বলেন, ‘বিদেশিরা আমাদের প্রকল্প বন্ধ করে দেবে আর আমরা মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকব নাকি? আমরা গণতান্ত্রিক দেশ এবং এখানে নির্বাচিত সরকার আছে। এখানে যে কেউ এসে মাতব্বরি করে যাবে, এটা হবে নাকি?’

ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে কিছু বিদেশি ঋণনির্ভর বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে বলে হুমকি পাওয়া যাচ্ছে এক সাংবাদিক এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চান। জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই। যেটা বাস্তব, সেটা নিয়ে কথা বলবেন।’ তিনি বলেন, ‘যারা (বিদেশিরা) প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে, তাদের কি স্বার্থ নেই? তারা কি ঋণের বদলে ইন্টারেস্ট (সুদ) পাচ্ছে না? তবে প্রকল্প যেন সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হয়, সেটা আমরাও চাই, তারাও (বিদেশিরা) চায়।’

বৈঠকে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশনাও প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রী।

পরিকল্পনা কমিশনের বিকল্প চেয়ারপারসন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, ভাইস চেয়ারপারসন পরিকল্পনামন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) আবদুস সালাম বৈঠকে অংশ নেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এবং কমিশনের সব সদস্যসহ অন্যরা অংশগ্রহণ করেন।

নতুন সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর পরিকল্পনা কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম বৈঠকের সংবাদ সম্মেলনে এসে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি পরিহার এবং উন্নয়ন প্রকল্প সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে একটি প্রকল্প পরিচালকের পুল তৈরি করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

তিনি বলেন, বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অভিজ্ঞ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ‘প্রকল্প পরিচালক পুল’ গঠন করার একটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প পরিচালক পুল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের বিভিন্ন সেক্টরে প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত অনেক বিশেষজ্ঞ রয়েছে। তাদের সমন্বয়ে এই পুল গঠন করা যায় কি না, আমরা চিন্তা করে দেখছি।’

এ ছাড়া বৈঠকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদের জন্য আলাদা পদ সৃষ্টি করা যায় কি না, চিন্তাভাবনা করার নির্দেশনাও প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রকল্পের অগ্রগতি পরিদর্শনের জন্য দুই মাস পরপর বৈঠক করবে। এতে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের অগ্রগতি বাড়বে এবং যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব সত্যজিৎ কর্মকার বলেন, বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে দেশে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চলমান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুযায়ী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিবি) বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয় না।

বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। চলমান অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে এডিপির মোট বরাদ্দের ১১ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও এ বছর দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। শিক্ষা ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনায় থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও এডিপিতে প্রকৃত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এই প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিশ্চিত করতে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যাতে আমরা আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারি, সেজন্য আরও বেশি বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে এবং অর্থ ছাড় করতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হবে। প্রতি মাসে অন্তত একটি সভা করবে এই কমিটি। এই কমিটিতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা থাকবেন। এ ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে তা অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া করে থাকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বিভাগ। এখন পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের সদস্যরা এতে সম্পৃক্ত হবেন।

পরিকল্পনা কমিশনের সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, একটি বিশেষ প্যানেল থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে। এই প্যানেলে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত হবেন। এমন প্যানেল গঠন করা যায় কি না, সে বিষয়ে কাজ করবে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া বর্তমানে বৈশ্বিক এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।

সম্ভাব্যতা যাচাই প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুস সালাম বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাছাই শক্তিশালী করতে হবে। সময় ও খরচ যাতে না বাড়ে এটা দেখতে হবে। পিডিদের (প্রকল্প পরিচালকদের) দক্ষতা কম, ফলে প্রকল্পের সময় বাড়ে। আমরা পিডিদের দক্ষতা বাড়াতে একটা বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করব। প্রকল্প পরিচালক যত দক্ষ হবেন, ততই প্রকল্প বাস্তবায়ন বাড়বে। প্রকল্পে বিলম্ব করা যাবে না, যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে। জিওবি খরচ বেশি করব, এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে, সেসব বিভাগে কী ধরনের প্রকল্প নিতে হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব সত্যজিৎ কর্মকারসহ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা।