দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও এক দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার দিন মাঠে থাকবে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো। বিএনপির সমমনাদের অন্যতম জোট গণতন্ত্র মঞ্চের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে এ কথা জানা গেছে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের স্থায়ী কমিটি ও সমমনা দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।
৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন ১০ জানুয়ারি। শপথ নেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন বসার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই দিন বেলা ৩টায় এ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ১৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অধিবেশন শুরু করতে রাষ্ট্রপতির এই আহ্বানের তথ্য জানানো হয়।
এদিকে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলার মধ্যেই গত সপ্তাহে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতারা বলেছেন, তারা একমঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা ভাবছেন। কিন্তু নিজ নিজ সুবিধামতো ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে সরকারবিরোধী এই দলগুলোকে।
নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যুগপৎভাবে হরতাল, অবরোধ, ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে কর্মসূচি পালন করেছে। লিফলেট বিতরণ করেছে। কিন্তু সরকার নির্বাচন করে ফেলেছে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করে চলেছে। তারা মনে করছে, শেখ হাসিনার
নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলগুলো। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনের পর নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে বিএনপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে। ঐক্যবদ্ধভাবে কবে নাগাদ মাঠে নামবে বিরোধী দলগুলো, সে বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছে বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে আবার বৈঠক করবে। আপাতত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ রাজনীতির পাশাপাশি একই দাবিতে পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। আমরা দলীয় কর্মসূচিও পালন করছি।’
সুবিধামতো নিজ নিজ কর্মসূচি পালনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দাবি আদায়ে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন, সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালন করেছে। ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে এ আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। সেটা কখনো যুগপৎভাবে, কখনো একমঞ্চ থেকে আবার কখনো আবার সমান্তরালভাবে হবে। এগুলো কোনো বিষয় নয় আমাদের কাছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যে কর্মসূচি পালন করি না কেন তা হবে শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক। এভাবে আন্দোলনের ভেতর দিয়েই জনগণ এ সরকারকে বিদায় করবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।’
গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দলটির মহাসমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা হয়। এতে এক পুলিশ সদস্যসহ দুজন নিহত হয়। এরপর থেকে প্রায় দুই মাস বিএনপি বিরতি দিয়ে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। তবে একপর্যায়ে এসব কর্মসূচি অকার্যকর হয়ে পড়ে। দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
নির্বাচনের আগে বিএনপি শক্ত কর্মসূচি না দিয়ে ভোট বর্জনের আহ্বান ও অসহযোগ কর্মসূচি পালন করে। নির্বাচনের পর দলটি আপাতত তাদের নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বিপরীত পাশে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি কার্যালয় ভাসানী ভবন ও গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো খুলে দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছে। পাশাপাশি দলের নেতাদের মুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে। ইতিমধ্যে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জামিনে মুক্ত হয়েছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলায় জামিন পেয়ে প্রকাশ্যে এসেছেন। এভাবে ধীরে ধীরে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বিএনপি নেতারা।
ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৭ জানুয়ারি নির্বাচন হয়ে গেছে। নির্বাচনে জনগণ ভোট বর্জন করেছে। দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ আমাদের চলমান আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে। এখন আমাদের দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাসহ সারা দেশের অসংখ্য নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছেন। তাদের জামিনে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী আন্দোলনে যাওয়ার আগে নেতাকর্মীদের একটু বিশ্রাম দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নেতাকর্মীরা জামিনে বেরিয়ে এলে ধাপে ধাপে কর্মসূচি পালন করা হবে।’
বিএনপি গতকাল দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও ‘অবৈধ সংসদ’ বাতিলসহ এক দফা দাবি আদায়ে সারা দেশের জেলা সদরে কালো পতাকা মিছিল করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ শনিবার রাজধানী ঢাকাসহ সকল মহানগরে কালো পতাকা মিছিল করবে দলটি। এ ছাড়া ১২ দলীয় জোট দুপুর সাড়ে ১২টায় বিজয়নগর পানির ট্যাংক সামনে থেকে, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) বেলা ১১টায় বিজয়নগর পানির ট্যাংক সামনে থেকে কালো পতাকা মিছিল করবে। তবে গণতন্ত্র মঞ্চ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আলোচনা সভা, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিজয়নগরে দলীয় অফিসে সংবাদ সম্মেলন করবে।
এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের মতো করে কর্মসূচি পালন করছি। আজ (গতকাল শুক্রবার) বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছি। সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি আমরা পালন করে যাব।’
অন্যদিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামীকাল রবিবার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং নির্বাচন বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে দেশের সব মহানগরীতে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে।
দলটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের জনগণের প্রতি কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।