নয়া বছরের শুরুতেই দেশে করোনা রোগী বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪০ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, তবে এ সময়ে কেউ মারা যায়নি। এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখ ৪৬ হাজার ৯০১। দেশে করোনার নতুন উপধরন জেএন.১ শনাক্ত হয়েছে। এই উপধরনের সংক্রমণ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। প্রতিরোধী টিকাদানের কার্যক্রমও শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুরুর দিকে বলা হয়েছিল, কভিডের টিকার কার্যকারিতা ছয় মাসের বেশি থাকবে না। তিন ডোজ টিকা নেওয়ার পর যাদের ৬ মাস সময় পেরিয়ে গেছে, তাদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে কি না, তাদের নতুন করে সব টিকা নিতে হবে, নাকি কেবল চতুর্থ ডোজ নিলেই হবেশ্ব এমন কিছু প্রশ্ন জনমনে তৈরি হয়েছে।
ভারতসহ ৪১ দেশে জেএন.১ উপধরনের ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতার কারণে জেএন.১ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের মতে, যেসব অঞ্চল বা দেশে শীতকাল চলছে, সেখানে শীতকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ জেএন.১-এর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
করোনার তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজের টিকা রবিবার (২১ জানুয়ারি) থেকে ঢাকার ৯টি কেন্দ্রে দেওয়া শুরু হয়েছে। জেএন.১ শনাক্ত হওয়া ও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার কারণে ১৮ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে টিকাদান শুরুর নির্দেশনা দেয়।
টিকা নিয়ে মানুষের মনে এখনো নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এর ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। যদিও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন এমন ভাবনার অবকাশ নেই। মানুষের মনে এ ধারণাও রয়েছে, একবার টিকা নিলে আর নেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু কভিডের তিন ডোজ টিকা নেওয়ার পর এখন চতুর্থ ডোজ নিতে বলা হচ্ছে। এর সঙ্গে বাণিজ্যিকতার সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও করছেন অনেকে।
কভিডের টিকার কার্যকারিতা মানুষের শরীরে কত দিন থাকেশ্ব এমন প্রশ্নে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধারণা করা হয়, টিকা নেওয়ার পর এর কার্যকারিতা আমাদের শরীরে ৬ মাস থেকে ১ বছর থাকে। সর্বনিম্ন ৬ মাস থাকে। এখনো এমন টিকার কথা জানা যায়নি, যা ৬ মাসের বেশি কার্যকর থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকাও ৬ মাসের বেশি কার্যকর থাকে না। সিজনের আগে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা দিতে হয়। এখন কভিডেরটাও একই রকম হয়ে যাচ্ছে। কভিডের ধরন সব সময় পরিবর্তমান। যারা টিকা নিয়েছেন কিংবা নেননি, সবাইকে টিকা নিতে হবে।’
দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডোজ টিকা নেওয়ার পর ৬ মাসের বেশি সময় যাদের পেরিয়ে গেছে, তাদের আবার সব ডোজ নিতে হবে কি নাশ্ব জানতে চাইলে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘আমাদের টিকা কার্যক্রমে একবার নেওয়ার পরও নতুন করে প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ বা নিয়মিত টিকা নেওয়ার বিষয়টি এখনো যুক্ত হয়নি। যখন নিয়মিত নেওয়ার মতো টিকার ডোজ তৈরি হবে, তখন এ রকম নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে; আপাতত এ সুযোগ নেই। যারা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ডোজ নিয়েছেন তাদের চতুর্থ ডোজ এবং যারা কোনো ডোজই নেননি, তাদের আগে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে তারপর নতুন ডোজ নিতে হবে। টিকার আরও ইমপ্রুভমেন্ট হয়তো হবে, তখন হয়তো অন্য নির্দেশনা দেওয়া হবে। আপাতত সুরক্ষিত থাকতে চতুর্থ ডোজ নিতে বলা হচ্ছে।’
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন তাদের নতুন করে আর নিতে হবে না, তিনি কেবল চতুর্থ ডোজ নেবেন। ৬ মাস পর টিকা যে একেবারে কার্যকর থাকে না, বিষয়টা এমন নয়। হয়তো অ্যান্টিবডির লেভেল কিছুটা কমে যায়, সেখানে এমন উপাদান থাকে যা ৬ মাস পরও কাজ করে। ৬ মাস পর কার শরীরে টিকার কার্যকারিতা আছে এবং কার নেই, সেটা কীভাবে নির্ধারিত হবে?’
তিনি বলেন, ‘মানুষ কভিড-১৯ শনাক্তের পরীক্ষা করাচ্ছে কম, শনাক্ত হচ্ছে না। অনেক মানুষ উপসর্গ নিয়ে আছে, কিন্তু পরীক্ষা করায় না। তাই শনাক্তের যে সংখ্যা আমরা দেখছি, তা সংক্রমণের বাস্তব চিত্র নয়।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখেছি, টিকার কার্যকারিতায় কোম্পানিভেদে পার্থক্য রয়েছে। যেসব টিকা বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। একই কোম্পানির আগের ব্যাচ ও পরের ব্যাচের টিকার মধ্যেও কিছু ভ্যারিয়েশন থাকে। সাধারণত কোনো টিকা গড়ে ন্যূনতম ৬ মাস, কখনো কখনো এর চেয়ে বেশি সময় কাজ করে।’
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকা ও নতুন টিকাগ্রহণ না করায় দেশের অধিকাংশ মানুষ করোনা প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি হারিয়েছে। আবার ভ্যারিয়েন্ট যখন পরিবর্তিত হয়, তখন পরিবর্তনের আগে যে টিকা কার্যকর ছিল, সেটা আর কার্যকর থাকে না। ফলে বুস্টার ডোজ সবারই নেওয়া ভালো। এখন যে টিকা দেওয়া হচ্ছে তাতে নতুন ভ্যারিয়েন্টকে প্রতিরোধ করার উপাদান যুক্ত করা আছে। বুস্টার নিতে হলে একজন মানুষকে কমপক্ষে দুইটা ডোজ নিয়ে রাখতে হবে।
হঠাৎ কভিড বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘নতুন ভ্যারিয়েন্টের (উপধরনের) বিপক্ষে আগের টিকাগুলো পুরোপুরি কার্যকর নয়; ফলে কভিডে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ^জুড়েই বাড়ছে। যদিও এখনো উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। আমাদের কভিডের মৌসুম আরও দুই-তিন মাস পর শুরু হবে, ফলে আমাদের এখনই প্রস্তুত হতে হবে। কভিড এখনো পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়নি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে। আমাদের হাত ধোয়া, মাস্ক পরার অভ্যাস করতে হবে, হাসপাতালের সংখ্যা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।’
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ধরন জেএন.১-এর লক্ষণ আগের ধরনগুলোর মতোই, যেমন জ¦র, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, স্বাদ বা গন্ধ হারানো, ক্লান্তি প্রভৃতি। গুরুতর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, ডায়রিয়া ও বিভ্রান্ত বোধ করা।
প্রসঙ্গত, প্রায় চার বছর আগে ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের জন্য এ পর্যন্ত ১ কোটি ৬৩ লাখের বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। করোনা শনাক্ত হয়েছে ২০ লাখ ৪৬ হাজার ৭১১ জনের। এ পর্যন্ত মারা গেছে ২৯ হাজার ৪৭৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা শহরের আটটি কেন্দ্রে তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজ হিসেবে ফাইজারের টিকা দেওয়া হবে। কেন্দ্রের তালিকায় আছে : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল এবং শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।