চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসন থেকে টানা তিনবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন সামশুল হক চৌধুরী। গত ৫ বছর ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সংসদের হুইপ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন তিনি।
জানা গেছে, তিনবার এমপি ও একবার হুইপ হয়ে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক বনে যান সামশুল হক। প্রতিষ্ঠা করেন দাতব্য প্রতিষ্ঠান পটিয়া ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পটিয়া হাসপাতালে একজন নিরাপত্তা কর্মী, একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী, একজন এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ও একজন ওটিবয় মোট চারজন কর্মচারী নিয়োগ দেন। পটিয়া ফাউন্ডেশন তাদের বেতন-ভাতা দিতেন। বিভিন্ন সভা সমাবেশে সামশুল হক চৌধুরী বলেছেন, যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন ততদিন এই কর্মসূচি চালু থাকবে। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হয়েই বন্ধ করে দেন পটিয়া হাসপাতালের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: সব্যসাচি নাথ বলেন, প্রায় এক বছর আগে থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়। নির্বাচনের পরে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এই কাজটি আর চালাবে না। বর্তমানে কার্যক্রমটি বন্ধ রয়েছে।
জানা যায়, এক সময়ের যুবদল নেতা সামশুল হক চৌধুরী দল পরিবর্তন করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে কমিশনার হন। পরবর্তীতে আবার আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে নেন; হয়ে যান সংসদ সদস্য। এমপি হওয়ার পর আর পিছনে ফিরে থাকাতে হয়নি সামশুল হক চৌধুরী ওরফে বিচ্ছুকে। হয়েছেন টানা তিনবার সংসদ সদস্য ও একবার হুইপ। হঠাৎ করেই গাড়ি বাড়ি ও বিপুল অর্থের মালিক বনে যান তিনি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া সামশুল হক চৌধুরী আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে প্রায় ৮৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। সামশুল হক এমপির বিরুদ্ধে দলে ‘মাইম্যান’ তৈরি, নিজ এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার, দলীয় নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টি থেকে দলে অনুপ্রবেশকারীদের মদদ দেওয়া, বড় বড় দুর্নীতি ও ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ও দুদকের খাতায় নাম লেখানো, স্থানীয় নির্বাচনে আর্থিক লেনদেন ও টিআর কাবিখা নিয়ে নয়ছয় করা, সেতু-কালভার্ট ও রাস্তা নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ সরকারের ভাব-মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে।
পটিয়াকে বদ্বীপ দেখিয়ে ভুয়া প্রকল্প তৈরি করাসহ বিভিন্ন প্রকল্প থেকে গত ১৫ বছরে কয়েকশত কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ আছে হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এমপি ও তার আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া ও নৌকার বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করানো ও তার সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, তিনবারের এমপি ও সংসদের হুইপ সামশুলের পরাজয়ের পেছনে নেতাকর্মীদের প্রতি জুলুম, অত্যাচার, হুইপের ভাই পরিচয় দানকারী আলমগীর খালেদ ও তার ভাই মিজানুর রহমানকে দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মামলা-হামলা করে নানাভাবে হয়রানি করেছেন। বিভাজনের মাধ্যমে দলের মধ্যে চরম কোন্দল সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাদের। তিন মেয়াদে এমপি থেকেও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেয়নি। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে তার পছন্দের বিএনপি জামায়াত জাতীয় পার্টি থেকে আসা নেতাকর্মীদের দিয়ে দল পরিচালনা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পটিয়া উপজেলা শ্রমিকলীগের প্রচার সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে এমপির ছত্রছায়ায় তার ভাই পরিচয়ে আলমগীর খালেদ ও মিজানের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিএনপির পক্ষ নিয়ে আমিসহ এলাকার ৪০-৫০ জন নেতাকর্মীকে ১০-১৫টা মিথ্যা মামলা দিয়েছে।