নাইট্রোজেনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখা সাংবাদিকের বর্ণনায় প্রশ্নবিদ্ধ মানবতা

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দণ্ডের প্রহর গোণার মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন কেনেথ স্মিথ, তবে তার মৃত্যু যে কতটা কষ্টদায়ক ছিল তা উঠে এসেছে ঘটনা পর্যবেক্ষণে উপস্থিত এক সাংবাদিকের বর্ণনায়।

দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল প্রায় ২৫ মিনিট। নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগের পরও কয়েক মিনিট পর্যন্ত তার জ্ঞান ছিল। দুই থেকে চার মিনিট পর্যন্ত তিনি স্ট্রেচারের ওপর ছটফট করেছেন, এরপর আরও পাঁচ মিনিট বড় বড় নিশ্বাস নিয়েছেন।

সমালোচকেরা বলছেন, অপরীক্ষিতভাবে কেনেথের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।   আলাবামা কর্তৃপক্ষ তাকে ‘গিনিপিগ’ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

১৯৮৮ সালে অপর এক সহযোগীকে নিয়ে মাত্র এক হাজার ডলারের বিনিময়ে এক নারীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন স্মিথ। এ ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুইজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। ২০১০ সালে স্মিথের সহযোগীর দণ্ড কার্যকর করা হয়।

নাইট্রোজেন গ্যাসের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে স্মিথ বর্ণনাতীত কষ্ট ভোগ করবেন বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। সেটাই সত্যি হয়েছে।

স্মিথের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে সেটি দেখেছেন পাঁচজন সাংবাদিক। তাদের দণ্ড কার্যকরের স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ওই সাংবাদিকদের একজন হলেন লি হেডগেপেথ। তিনি জানিয়েছেন, বেল্ট দিয়ে হাত-পা বাধার যেই বিশেষ স্ট্রেচারে স্মিথকে শোয়ানো হয়েছিল, সেটিতে প্রচন্ড ছটফট করেছেন তিনি এবং সবমিলিয়ে দণ্ড কার্যকরে ২৫ মিনিটের বেশি সময় লেগেছে।  

তিনি আরও জানিয়েছেন, যখন মুখে নাইট্রোজেন গ্যাসের মাস্ক পরানো হয় তখন স্মিথ উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আলাবামা আজ মানবতাকে এক ধাপ পেছনে নিয়ে গেছে। আমার পাশে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। সবাইকে ভালোবাসি।’

যখন মাস্কের মাধ্যমে নাইট্রোজেন গ্যাস তার মুখে প্রবেশ করা শুরু করে তখন স্মিথ হাসেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসার চিহ্ন দেখান বলে জানিয়েছেন এই সাংবাদিক।

সাংবাদিক লি হেডগেপেথ বিবিসিকে বলেন, ‘আমি এর আগে আরও চারটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু নাইট্রোজেন গ্যাসের প্রভাবে স্মিথ যেভাবে ছটফট করেছে; এ রকমটি কখনো দেখিনি। সে অক্সিজেনের জন্য অব্যাহতভাবে হাঁসফাস করছিল এবং দণ্ড কার্যকরে ২৫ মিনিট সময় লেগেছে।’  

অক্সিজেন ছাড়া নাইট্রোজেন গ্যাস শুষে নিলে এটি দেহের কোষগুলো ভেঙে ফেলে এবং পরিশেষে মৃত্যু হয়।

আলাবামা রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নাইট্রোজেন গ্যাস শুষে নিলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্মিথ জ্ঞান হারাবেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে তার মৃত্যু হবে। তবে তাদের সেই ধারণার তুলনায় সময় অনেক বেশি লেগেছে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অক্সিজেনের জন্য তিনি ছটফট করেছেন।

‘অপরীক্ষিত ও নতুন’ এ পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাও এ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেসব আপত্তি আমলে না নিয়ে আলাবামায় কেনেথ স্মিথের দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত তিনটি অঙ্গরাজ্যে নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতিটি অনুমোদন পেয়েছে। তিনটি অঙ্গরাজ্য হলো—আলাবামা, ওকলাহোমা ও মিসিসিপি। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার আলাবামা অঙ্গরাজ্যের হোলম্যান কারাগারে প্রথমবারের মতো নাইট্রোজেন হাইপোক্সিয়া ব্যবহার করে এক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও প্রথম ঘটনা।

একুশ শতকে মৃত্যুদণ্ড এমনিতেই কাম্য নয়, তার ওপর এমন ভয়াবহ যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।