যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা করবে না ইরান। এখন প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চার ধাপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তারা বলছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার যুগ স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে গেছে। এখন থেকে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা এককভাবে ইরানের কর্তৃত্বে থাকবে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) তেহরানের অস্থায়ী জুমার নামাজের খতিব হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ-আলি-আকবারি এসব কথা জানান।
রাজধানী তেহরানে মুসল্লিদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, প্রতিশোধমূলক এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার সঙ্গে জড়িত পরিকল্পনাকারী, হামলাকারী ও সহযোগীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে।
তার ঘোষিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়ে অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয় ধাপে, পশ্চিম এশিয়া থেকে ইসরায়েলকে সরিয়ে দেওয়ার এবং চতুর্থ ধাপে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অবসান ঘটানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
হাজ-আলি-আকবারি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থা, পাশাপাশি কূটনৈতিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম ধাপের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইরানের অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।ইরানের এই ধর্মীয় নেতা বলেন, প্রতিশোধের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হবে আল-আকসা মসজিদ থেকে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি, অঞ্চল থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অপসারণ এবং বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
হাজ-আলি-আকবারি জানান, দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার পর কূটনৈতিক সমঝোতার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তার দাবি, এসব হামলায় সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো, পরিবেশগত স্থাপনা এবং শহীদ বাঘাই হাসপাতাল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে পড়েছে।
ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সম্পর্ক নির্ধারিত হবে শুধু ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে। তেহরানের এই ধর্মীয় নেতা হরমুজ প্রণালিকে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ইরান নিজেই করবে এবং আগের পরিস্থিতিতে আর ফিরে যাওয়া হবে না।
হাজ-আলি-আকবারি দাবি করেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার জবাবে ইরানি বাহিনী দ্রুত ও ব্যাপক পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
এসময় তিনি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের খুজেস্তান, বুশেহর ও হরমোজগান প্রদেশের বাসিন্দাদের প্রশংসা করেন এবং দেশের প্রতিরক্ষায় তাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। খুতবার একটি বড় অংশে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন হাজ-আলি-আকবারি।
তিনি বলেন, এই বিশাল জনসমাগম পশ্চিমা প্রচারণা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এটি ইরানের ইসলামি মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ।
তিনি জানান, জানাজায় প্রদর্শিত ‘ইয়া লাথারাত’ (হে প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা) পতাকাগুলো জনগণের প্রতিশোধের দাবির প্রতীক। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ইরাকের সহযোগিতার প্রশংসা করেন হাজ-আলি-আকবারি। তিনি বলেন, প্রয়াত নেতার প্রতি শোক জানাতে ইরাকে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিল।
তিনি এই সমাবেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির বিদায় অনুষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করেন। আরবি ভাষায় দেওয়া বক্তব্যের একাংশে তিনি ইরাকের জনগণ, নাজাফের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, দেশটির সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন গোত্রকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এসব আয়োজন সীমান্তপারের ইসলামি ঐক্যের প্রতিফলন।