পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লেও খুচরায় আনুপাতিক হারে দাম বাড়াতে না পারায় লোকসান গুনছে পুুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)। চলতি ২০২৩-২৪ হিসাববছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৯৫ কোটি টাকা। বিনিময় হারের লোকসানও কোম্পানির আর্থিক ক্ষতিতে প্রভাব রাখছে।
বিনিময় হারের কারণে ২০২২-২৩ হিসাববছরেও ব্যাপক লোকসান গুনতে হয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটিকে। সে সময় ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে ডেসকো ৫৪১ কোটি টাকা নিট লোকসান দেয়, যার মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে লোকসান হয়েছিল ৪২৮ কোটি টাকা। আর এই লোকসানের বেশিরভাগই আসে ওই হিসাববছরের শেষ প্রান্তিকে। আর বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় ১১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল। চলতি ২০২৩-২৪ হিসাববছরেও এ দুই খাতে লোকসান অব্যাহত রয়েছে। তবে এর পরিমাণ কিছুটা কম।
গতকাল প্রকাশিত চলতি প্রথমার্ধের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ডেসকো জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ হিসাববছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিনিময় হারে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি টাকা। লোকসানের অবশিষ্ট অংশ এসেছে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রির কারণে।
গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে চলতি ২০২৩-২৪ হিসাববছরের প্রথমার্ধে ডেসকোর আয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। তবে আয় বাড়লেও এর সিংহভাগই চলে যাচ্ছে পাইকারি বিদ্যুৎ কিনতে। ফলে মোট আয় যা হচ্ছে তা দিয়ে কোম্পানিটি পরিচালন ব্যয় চালাতে পারছে না।
ডেসকোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি প্রথমার্ধে বিদ্যুৎ কিনতে কোম্পানিটির ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা মোট বিক্রি থেকে আয়ের ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২২-২৩ হিসাববছরের প্রথমার্ধে মোট বিক্রির ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল বিদ্যুৎ কেনায়। বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার পর চলতি প্রথমার্ধে বিদ্যুৎ বিতরণ থেকে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১৯০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৩৩ কোটি টাকা। এ সময় অন্যান্য আয়ও কিছুটা বেড়েছে। এর ফলে চলতি প্রথমার্ধে ডেসকোর পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ২৩১ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ কম।
পরিচালন আয় কমলেও চলতি প্রথমার্ধে ডেসকোর বিদ্যুৎ বিক্রির খরচ, প্রশাসনিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে করে কোম্পানিটি পরিচালন মুনাফায় লোকসান করেছে। বিদ্যুৎ বিক্রিতে সরাসরি পরিচালন খরচ ও অবচয় বাবদ চলতি প্রথমার্ধে ডেসকোর ব্যয় হয় ১৭৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫৫ কোটি টাকা। এ সময় কর্মীদের বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়সহ পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪২ কোটি টাকা।
পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের পরই কোম্পানিটি লোকসানে পড়েছে। এ সময় পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৯৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ৫১ কোটি টাকা বাড়তি ছিল। টাকার বিপরীতে বিদেশি মুদ্রার দাম বাড়ায় চলতি প্রথমার্ধে কোম্পানিটির ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ সময় বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ডেসকোর ব্যয় হয় ৭৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। সরকার ছাড়াও এডিবি, এআইআইবি ও জাইকার ঋণ রয়েছে ডেসকোতে। এ সময় বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসান হয়েছে ৩০ কোটি টাকা।
চলতি প্রথমার্ধে কর-পূর্ববর্তী লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আর কর পরিশোধের পর ডেসকোর নিট লোকসান দাঁড়ায় ১৯৫ কোটি ১১ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।