অতি আবেগে ভুল সিদ্ধান্ত

কিশোর বয়সে হরমোনজনিত কারণে শিক্ষার্থীরা বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। এ কারণে তারা আত্মহত্যার মতো অতি আবেগীয় সিদ্ধান্তগুলো নেয়। এই প্রবণতার হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার স্থাপনের জন্যও জোর দিয়েছেন তারা। যদিও গত বছরের তুলনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমেছে। তবে সেটা আশানুরূপ নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘২০২৩ সালে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা : পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জানানো হয় গত এক বছরে অভিমান, প্রেমঘটিত সমস্যাসহ নানা কারণে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহনন করেছে। যা ২০২২ সালে ছিল ৫৩২ জন। বছরব্যাপী ১০৫টি জাতীয়, স্থানীয় পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টাল থেকে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ করা হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংস্থাটি ১০টি প্রস্তাবনাও দিয়েছে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের সুপারিশে প্রতি মাসে অন্তত একবার সমস্ত শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া এটি দ্রুত ও সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার স্থাপন এবং একটি টোল ফ্রি জাতীয় হটলাইন চালু করারও সুপারিশ করেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. সাইদুর রহমান বলেন, এই বয়সে আবেগজনিত সমস্যা, পড়ালেখার চাপ ও পারিবারিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করতে দেখা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাগুলো শনাক্ত করা হয় না। তারা সমস্যার কথা বলার মতো জায়গাও পায় না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা ঠেকাতে আমাদের উচিত তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগী হওয়া। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য এবং শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দায়িত্বশীল হতে হবে, যেন তারা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে যতœবান হতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড.  মেহজাবিন হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আত্মহত্যা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। মানসিক অসুস্থতা, মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের আসক্তি, পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় না থাকার ফলে এর ঝুঁকি বাড়ে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে আপন মানুষকে, বিশেষ করে পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা প্রয়োজন। এই সেবার জায়গাগুলো সহজ করে দিতে হবে। এসব বিষয়ে আমরা যত কথা বলব, যত জানব, ততই আমরা এখান  থেকে বের হয়ে আসতে পারব। আমরা সবাই সচেতন হলে ঘটনাগুলো কমানো সম্ভব।’

 

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৩ সালে আত্মহত্যাকারী ৫১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ছিল ২০৪ জন যা ৩৯.৮ শতাংশ। অন্যদিকে নারী শিক্ষার্থী ছিল ৩০৯ জন যা ৬০.২ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অভিমান, যা সংখ্যায় ১৬৫ জন (৩২.২ শতাংশ)। এরপরেই প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যা করে ১৪.৮ শতাংশ। মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে  নেয় ৯.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী, পারিবারিক কলহে ৬.২ শতাংশ, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে ১.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে আত্মহত্যা করেছে ১৪৯ জন শিক্ষার্থী। এরপরই অবস্থান করছে চট্টগ্রাম বিভাগ। চট্টগ্রাম বিভাগে আত্মহত্যা করেছে ৮৯ জন। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন ঢাকা শহরে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার সহায়ক পরিবেশ না থাকায় এখানে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে।

জরিপে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালে মোট আত্মহত্যাকারী ৫১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৯৮ জন, যা মোট সংখ্যার ১৯.১ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ জন, সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ব্যাপকহারে আত্মহত্যার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রেমঘটিত কারণ।