বেকারের আকার

‘বেকার’ শব্দটি এসেছে ‘কার’ শব্দ থেকে। এই ‘কার’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘কর্ম’। এর সঙ্গে নঞর্থক ‘বে’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে হয়েছে ‘বেকার’ শব্দ। এর অর্থ যার কোনো কাজ নেই, সেই বেকার।

আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে কাজপ্রত্যাশী একজন মানুষ যদি সর্বশেষ ৭ দিনে মজুরির বিনিময়ে ১ ঘণ্টা কাজ করারও সুযোগ না পান, তাহলে তাকে বেকার ধরা হবে। এই কারণেই একজন মুরগি পালককেও ‘বেকার’ বলে না বিবিএস। সম্ভবত, এখানে মুরগি পালকের কাজ হচ্ছে মুরগিকে লালন-পালন করে ভবিষ্যতে বিক্রি করে অর্থ আয় করা। যে কারণে তার একটা ‘আকার’ হয়েছে। অর্থনীতির পরিভাষায় বেকার সেই, যে কাজ করার যোগ্যতা এবং ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বা কাজের সুযোগ পায় না। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যখন সমাজে যথেষ্ট কর্মক্ষম ব্যক্তির বিপরীতে কর্মসুযোগ কম থাকে তখনই বেকারত্ব দেখা দেয়। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ পড়াশোনা শেষ করে চাকরির মাধ্যমে আয়-উপার্জন করতে পছন্দ করেন। কিন্তু বেকারত্ব সমস্যা তীব্র হওয়ার ফলে তা সম্ভব হচ্ছে না অনেকাংশে।

যখন ডলার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ঋণসুবিধাও কমে গেছে, দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে, সংকুচিত হয়েছে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা কর্মী ছাঁটাইয়ে যখন মনোযোগী, তখন দেশে বেকার বেড়ে যাওয়ার কথা। অথচ সরকারি হিসাব বলছে, বেকার কমেছে ৯০ হাজার। জানা গেল, দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে। ‘বেকার কমার ভুতুড়ে হিসাব’ প্রতিবেদন আরও জানাচ্ছে সরকারি হিসাবে বেকার কমলেও দেশের অর্থনীতির চিত্র পুরো উল্টো। খরচ কমিয়ে আনার অংশ হিসেবে সরকার অনেক উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত রেখেছে। ন্যূনতম রিজার্ভ ধরে রাখা ও ডলার বাঁচাতে আমদানিও সীমিত করে এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য ২০২৩ সাল ছিল সবচেয়ে সংকটের বছর। বছর জুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে অনেক কোম্পানিকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। উৎপাদন কমার ফলে আয়, মুনাফা দুটোই কমেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে, মোট আমদানি যেমন কমেছে, বিপরীতে কমেছে দেশের রপ্তানি আয়ও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বর্তমান যে শিক্ষাব্যবস্থা, এর চাহিদা বাজারে নেই বলে শিক্ষিত বেকার বেশি।’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার এখন ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কর্মহীন বসে আছেন প্রায় ৮ লাখ নারী-পুরুষ।

বেকারত্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। শিক্ষিত ও তরুণদের ছাড়া এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ২০২২ সালে একজন যুবক ‘ভাতের জন্য শিক্ষা দেওয়ার বিজ্ঞাপন’ দেওয়ার পরে কভিড প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল, তার একটি চিত্র পাওয়া গেছে। বেকারত্ব বিশ্বব্যাপী এক মানবিক, আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা। যার প্রভাবে সমাজে দেখা দেয় বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম বাধা বেকারত্ব। সবাই জানেন, কর্মহীন জীবন মানেই অভিশপ্ত জীবন। বেকার মানুষ নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশ ও জাতির জন্য বোঝা। এই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।

আমরা জানি না, কোন কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে উন্নত দেশ-ভবিষ্যতের স্বপ্ন লুকিয়ে রয়েছে? সে কারণেই যাতে একজন ভবিষ্যৎ স্বপ্নদ্রষ্ট্রাকে রক্ষা করা যায়, তার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। যদিও শুধু সরকারের পক্ষে বেকার সমস্যার শতভাগ সমাধান সম্ভব নয়। এই যন্ত্রণা, অসহায়ত্বের সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের মধ্যেই। আমরা যেন এই স্থির মেধাবীদের একটি নির্দিষ্ট আকারে পরিচয় চিহ্নিত করতে পারি।