জনশক্তি রপ্তানির নামে তুঘলকিকাণ্ড চলছেই। আমাদের শ্রমবাজারে নানা সময়ে এর অভিঘাত বহুমুখী ক্ষতির চিত্র স্ফীত করেছে। কত প্রাণ ঝরে গেছে, কতজন সর্বহারার তালিকায় নামে লিখিয়েছে, কত পরিবার পথে বসেছে উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় প্রতারকদের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে, এর হিসাব মেলানো ভার। ফের এরই চিত্র উঠে এসেছে ১৬ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিদেশে ভালো চাকরি, মোটা বেতনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে নারীদের নেওয়া হয় মালয়েশিয়ায়। কাউকে গার্মেন্টসে চাকরির, কাউকে মার্কেট বা সুপারশপে কাজের, আবার কাউকে রেস্টুরেন্ট বা পার্লারে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু মালয়েশিয়ায় পৌঁছার পর বদলে যায় পুরো চিত্র। তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর আটকে রেখে মারধর করা, ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে তাদের অসামাজিক কাজে বাধ্য করা হয়। কথা না শুনলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ‘বিক্রি’ হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয় অনেককে। আমরা ইতিপূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও এমনটি দেখেছি সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে।
একই দিন দেশ রূপান্তরের অনলাইন সংস্করণে ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়ায় সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের জন্য জড়ো করা নারীসহ ১৫ জনকে উদ্ধার করেন বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন রোহিঙ্গা, বাকি ১৩ জন বাংলাদেশি। আদম ব্যাপারী বা অবৈধ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের কারসাজিতে দেশের প্রবাসী আয়ের খাত ও অর্থনীতির জন্য যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু চক্র উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার জালে আবদ্ধ করছে। জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে লাখ লাখ টাকা দিয়ে বিদেশে গিয়ে মানুষ যখন প্রতারিত হয়, তখন তা কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির ওপর বড় আঘাত লাগে। আমাদের স্মরণে আছে, ২০১৫ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী পের্লিস রাজ্যের জঙ্গলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাগরিকদের মানব পাচারকারী শিবিরে শত শত কঙ্কাল ও গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছিল। সাগর কিংবা মরুপথে প্রতারকদের খপ্পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধ অভিবাসনের পথে পা বাড়িয়ে নিভে গেছে আরও কত জীবন প্রদীপ!
আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র সাধারণ মানুষকে উন্নত দেশের ভুয়া স্বপ্ন দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাচার করে আসছে। আবার অনেকে ট্যুরিস্ট, স্টুডেন্ট বা সাময়িক কাজের ভিসা নিয়ে বৈধভাবে প্রবেশ করলেও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে থেকে গিয়ে পরে পড়ছেন বিপাকে। এক্ষেত্রেও ওঁৎ পেতে থাকে প্রতারকরা। অবৈধ অভিবাসীরা প্রায়ই মানব পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই নামমাত্র মজুরিতে বিপজ্জনক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ধরা পড়লে আটক, জেল, জরিমানা বা নিজ দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়। দীর্ঘদিনের এই মানবিক সংকট নিরসনে কথা হয়েছে বিস্তর, কিন্তু কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি সাম্প্রতিক মালয়েশিয়ার চিত্র এরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। অনেকে জীবনঝুঁকি জেনেও এ পথে পা দিচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, ভালো মজুরি ও উন্নত জীবনযাত্রার অভাবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে সচেতনতার ঘাটতি।
দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন থাকলেও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার হার অত্যন্ত কম। তথ্য ও প্রমাণের অভাব, সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় মূলহোতারা পার পেয়ে যায়। ফলে পাচারকারী চক্রগুলোর তৎপরতা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমরা মনে করি, পাচারকারী চক্র এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে উৎসে নজর দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের সহায়তায় ব্যাপক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো জরুরি। সরকারিভাবে কম খরচে ও নিরাপদ উপায়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ অবৈধ পথের ঝুঁকি না নেয়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি এবং কোস্ট গার্ডের যৌথ ও সমন্বিত নজরদারি সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।