হাম-ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ এএম

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনিতেই নানা চাপে থাকে। এর মধ্যে একসঙ্গে দুটি সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। কয়েক মাস ধরে দেশে হামের প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ চলছে। বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আমাদের টিকাদান কর্মসূচির কিছু দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনেছে। সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি সামলে ওঠার আগেই এখন বাড়ছে ডেঙ্গু। সামনে ডেঙ্গু আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তাই প্রশ্নটি এখন শুধু কতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন, সেটি নয়। বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসন্ন চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত? ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া কোনো রোগ নয়। প্রায় প্রতি বছরই আমরা জানি বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এর প্রকোপ বাড়তে পারে। আমরা জানি এডিস মশা কোথায় জন্মায়, কীভাবে সংক্রমণ ছড়ায় এবং কোন সময়টায় পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তারপরও বছরের পর বছর প্রায় একই দৃশ্য দেখতে হয়। রোগী বাড়তে শুরু করলে মশা নিধন অভিযান জোরদার হয়, পরিচ্ছন্নতার কথা বলা হয়, হাসপাতালের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সেই তৎপরতাও ধীরে ধীরে কমে যায়। ডেঙ্গু এবার ছড়িয়ে গেছে প্রায় সারাদেশে এবং দেখা যাচ্ছে তা এখন শুধু মৌসুমেই আবদ্ধ নয়।  

এ বছর অবশ্য পরিস্থিতি আরেকটু জটিল। কারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একই সময়ে হামের মতো আরেকটি সংক্রামক রোগের চাপও সামলাতে হচ্ছে। যদিও হাম এবং ডেঙ্গু সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি রোগ। একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। অন্যটি এডিস মশাবাহিত এবং এর প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও ব্যক্তিগত সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুটি রোগের মধ্যে একটি জায়গায় বড় মিল আছে। দুটিই আমাদের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতির দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। হামের প্রকোপ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার ভালো দেখালেও কিছু শিশু টিকার বাইরে থেকে যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সংখ্যা বেশি হলে সেখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও শুধু শহরজুড়ে গড় পরিস্থিতি দেখলে হবে না। কোন এলাকায় রোগী দ্রুত বাড়ছে, কোথায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় নির্মাণকাজ বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পানি জমছে এসব তথ্য ধরে ছোট ছোট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা দরকার। ডেঙ্গু মোকাবিলার আরেকটি পরিচিত সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় রোগী বাড়ার পর বেশি সক্রিয় হই। তখন ফগিং বাড়ে, অভিযান শুরু হয়, সচেতনতামূলক প্রচারণাও জোরদার হয়। কিন্তু এডিস নিয়ন্ত্রণ এলে কয়েক সপ্তাহের অভিযান নয়। এটি সারা বছরের কাজ, যা বর্ষার আগে আরও নিবিড় হওয়া প্রয়োজন।

এখন সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হওয়া উচিত হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য চাপের জন্য প্রস্তুত করা। ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে, এমন নয়। অধিকাংশ রোগী সঠিক পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাড়িতেই সুস্থ হতে পারেন। কিন্তু কিছু রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাদের সময়মতো শনাক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত পরিষ্কার রোগী ব্যবস্থাপনা ও রেফারেল ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোন রোগী বাড়িতে থাকবেন, কাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, কখন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এসব বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। এতে গুরুতর রোগী দ্রুত চিকিৎসা পাবেন, আবার হাসপাতালের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কমবে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পুরো দায়িত্ব সরকার বা সিটি করপোরেশনের ওপর দিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। এডিস মশা আমাদের বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা অল্প জমে থাকা পানিতেও জন্মাতে পারে। নিজের বাড়ি ও আশপাশ নিয়মিত পরীক্ষা করার দায়িত্ব তাই নাগরিকেরও। সপ্তাহে অন্তত একদিন কয়েক মিনিট সময় নিয়ে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলাও বড় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হতে পারে।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা হযবরল এই অভিযোগ নতুন  নয়। দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির অভাব, এও পুরনো অভিযোগ। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত অনেক চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ের পুরোটা কর্মস্থলে ব্যয় করেন না, এ অভিযোগও  পুরনো। জনবল সংকট, রোগব্যাধির বিস্তার এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার মতো সংকটের মুখোমুখি বাংলাদেশ। অনিয়ম-দুর্নীতি এ ক্ষেত্রে অন্যতম উপসর্গ। করোনা দুর্যোগের পর চলমান হাম-ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও অনেক অপ্রীতিকর চিত্র ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। অথচ এগুলোর প্রতিবিধান যথাযথভাবে হয়নি কিংবা কেন হচ্ছে না এর জবাব দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারেন না। 

হাম ও ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়। জনস্বাস্থ্য মানে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়। বরং কোথায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কারা বেশি ঝুঁকিতে আছে এবং কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর কী ধরনের চাপ আসতে পারে, সেটি আগে থেকে বুঝে ব্যবস্থা নেওয়াই কার্যকর জনস্বাস্থ্যের মূল কথা। হামের প্রকোপ ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও সতর্কবার্তাটি স্পষ্ট। এখন যদি আমরা হাসপাতাল ভরে যাওয়া, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া কিংবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার অপেক্ষা করি, তাহলে সেটি অপ্রত্যাশিত কোনো সংকট হবে না। বরং সেটি হবে আগে থেকেই জানা একটি ঝুঁকির জন্য সময়মতো প্রস্তুতি নিতে না পারার ফল।

লেখক : হেলথ সার্ভিস রিসার্চার ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক, আয়ারল্যান্ড

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত