কত হাজার মরলে পরে মানবে তারা

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে মতামত। যার কয়েকটি অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

শুক্রবার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এ ঐতিহাসিক নির্দেশ দেয়। যুদ্ধ বন্ধের কথা না বললেও তারা ইসরায়েলকে নির্দেশ দিয়েছে ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে। আদালতের আদেশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা এক মাসের মধ্যে আইসিজেতে জানাতেও ইসরায়েলের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইসিজের এ আদেশ ফিলিস্তিনিদের জন্য এক ধরনের বিজয়। তবে কথা হলো, এ আদেশ কতটা কার্যকর হবে। ইসরায়েল যদি যুদ্ধ বন্ধ না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ইতিমধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি যুদ্ধ বন্ধ করবেন না।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এরপর গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এই হামলায় গাজা উপত্যকায় ২৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। যার বেশিরভাগই নারী ও শিশু। ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের ফলে গাজার ২৩ লাখ অধিবাসীর ৮৫ শতাংশই বাস্তুচ্যুত। যারা যুদ্ধ থেকে পালিয়েছে তারা আশ্রয় নিয়েছে জরাজীর্ণ, উপচে পড়া আশ্রয়কেন্দ্রে, যেখানে তেমন কোনো স্বাস্থ্যসেবা বা মানবিক সাহায্য নেই বললেই চলে।

কী হয়েছিল আদালতে

বিবিসি বাংলা জানায়, আইসিজের প্রেসিডেন্ট য্ক্তুরাষ্ট্রের জোয়ান ডনোঘেউর বক্তব্যের শুরুতেই বোঝা যায় যে, আদালত গাজার জরুরি অবস্থার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আমলে নিয়েছে এবং ইসরায়েলের মামলা খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টা সফল হয়নি। জোয়ান ডনোঘেউ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিরা যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে তার একটা সারাংশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশেষ করে শিশুদের কষ্ট ‘সবচেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক’।

দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, আইসিজের আদেশে গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে এমন কোনো রায় দেওয়া হয়নি। এ রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও। কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তাও জানা যায় না।

আল জাজিরায় আরিশা লোধি জানাচ্ছেন, ইসরায়েল অভিযোগ তুলেছিল আদালতের নিয়ম অনুসারে দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজেতে আবেদন করার আগে তেল আবিবের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ করেনি। তবে আইসিজে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। তারা জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রিটোরিয়ায় ইসরায়েলি দূতাবাসে একটি অভিযোগ করেছিল। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে মামলা দাখিলের যৌক্তিক অবস্থান রয়েছে। সেগুলো হলো গাজায় এবং এর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত করতে হবে। সামরিক অভিযান আর বাড়ানো যাবে না। পর্যাপ্ত খাবার, পানি, জ্বালানি, আশ্রয়, স্বাস্থ্যবিধি এবং স্যানিটেশন প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিসহ গাজায় ফিলিস্তিনিদের জীবন ধ্বংস রোধ করতে হবে। গণহত্যার অভিযোগকে সমর্থন করে এমন প্রমাণ ধ্বংস করা যাবে না। এসব প্রমাণ সংরক্ষণে সহায়তার জন্য তথ্য অনুসন্ধান মিশনকে গাজায় প্রবেশ করতে দিতে হবে। গণহত্যা কনভেনশনের নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা গণহত্যায় জড়িত তাদের শাস্তির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। মামলাকে জটিল বা দীর্ঘায়িত করবে এমন কাজগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে ইসরায়েলকে নিয়মিতভাবে কাউন্সিলের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

আইসিজে ইসরায়েলকে ছয়টি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। সেগুলো হলো ১. ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২-এ বর্ণিত কাজগুলো প্রতিরোধের জন্য ইসরায়েলকে অবশ্যই সব সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিতে হবে। যা হলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যদের (এ ক্ষেত্রে, ফিলিস্তিনিদের) হত্যা না করা, সেই গোষ্ঠীর সদস্যদের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি না করা, জীবনযাত্রার অবস্থার ওপর আঘাত না করা। ২. ইসরায়েলকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, তার সামরিক বাহিনী উপরোক্ত কোনো কর্মকাণ্ড চালাবে না। ৩. ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা পরিচালনার জন্য প্রত্যক্ষ ও প্রকাশ্য প্ররোচনা চালানো প্রতিরোধ করতে হবে এবং এ জন্য শাস্তি দিতে হবে। ৪. ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজার বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মৌলিক পরিষেবা এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। ৫. ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ ধ্বংস করা রোধ করতে হবে এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনকে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। ৬. ইসরায়েলকে অবশ্যই রায়ের এক মাসের মধ্যে আদালতের দ্বারা আরোপিত ব্যবস্থাগুলো মেনে চলার জন্য নেওয়া সব পদক্ষেপের একটি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা এই প্রতিবেদনে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পাবে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানা যায়, যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে সেগুলো মূলত গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের সুরক্ষার কথা ভেবে করা হয়েছে, একই সঙ্গে বিচারকরা দক্ষিণ আফ্রিকার মূল যে অভিযোগ সেটা নিয়েও কাজ করবে।

ইসরায়েল কি মানতে বাধ্য

ইসরায়েলকে আইসিজের আদেশ মেনে চলতে ইউএনএসসি যদি প্রস্তাব পাস করে, তাহলে তার পক্ষে সম্ভব হবে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। জাতিসংঘের কাউন্সিলের মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করে হস্তক্ষেপের অনুমতি দেওয়াও সম্ভব। যেমন ১৯৯১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট কুয়েতে আক্রমণের পাল্টা হিসাবে ইরাকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেবে না।

শুক্রবারের রায়টি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার অনুরোধে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ। ইসরায়েলকে ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব আদেশ পূরণের বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্যও প্রতিবেদন বিষয়ে জবাব দেওয়ার সুযোগ থাকবে। আদালত  প্রতিবেদনটি মূল্যায়ন করবে। সেখানে কোনো ঘাটতি দেখলে নতুন বিধান আরোপ করা হবে।

এরপর আদালতে অতিরিক্ত শুনানি হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে এবং ইসরায়েল যে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে সেসব তথ্য-প্রমাণের ওপর আলোচনা হবে। বিচারকরা পৃথকভাবে গাজায় গণহত্যা সম্পর্কিত দক্ষিণ আফ্রিকার মূল দাবিগুলো মূল্যায়ন করবেন এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা নির্ধারিত হবে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি আদালতের এই রায়ের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরায়েলের অগাধ শ্রদ্ধা আছে, একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার ব্যাপারেও আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে সেগুলো মূলত গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের সুরক্ষার কথা ভেবে করা হয়েছে, একই সঙ্গে বিচারকরা দক্ষিণ আফ্রিকার মূল যে অভিযোগ সেটা নিয়েও কাজ করবে।

আইসিজের রায়ের আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, কিন্তু তা প্রয়োগে বাধ্য করার ক্ষমতা নেই তাদের। ইসরায়েল চাইলে বিচারকদের অবজ্ঞাও করতে পারে। ইসরায়েল পাল্টা যুক্তি দেখাতে পারে যে, তারা আদালতের চাহিদা পূরণে এরই মধ্যে কাজ করছে। তবে এরপরও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ টিকে থাকবে। যে মামলার ব্যাপারে আইসিজে মনে করে এটির বিশ্বাসযোগ্যতা আছে এবং আরেকটু বিশ্লেষণ করে দেখা যায়। এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় আসতে কয়েক বছরও লেগে যাতে পারে।

বিপদে পশ্চিম

আইসিজের এ রায়ে বিপদে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। ইসরায়েলের পক্ষে তারা এখন কোন মুখে দাঁড়াবে, বিষয়টি যেন সেখানে গিয়ে ঠেকল। দ্য গার্ডিয়ানে প্যাট্রিক উইনটোর লিখেছেন, এ নির্দেশ ইসরায়েলের জন্য ধ্বংসাত্মক এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের মতো রাজনীতিবিদদের জন্য কুৎসিত। কারণ ব্লিঙ্কেন বলেছিলেন, মামলাটির মেরিট নেই। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলেছিলেন গণহত্যার মতো শব্দ ব্যবহার না করতে। আদালতের নির্দেশ তাদের কথাকে অসাড় প্রমাণ করে দেয়।

প্যাট্রিক উইনটোর আরও লিখেছেন, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বা ‘গণহত্যা’র মতো ধারণাগুলো ইহুদি আইনের অধ্যাপক রাফেল লেমকিন দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। অথচ তার জাতির বিরুদ্ধেই এখন সেগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। আর ব্যবহার করছে খোদ আন্তর্জাতিক আদালত।

তিনি জানাচ্ছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার এ মামলার বিষয়ে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গোপন তারবার্তা পাওয়া যায়, যা এক মাস আগের। সেখানে সতর্ক করা হয়েছিল এই বলে যে, মামলাটির উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকতে পারে, যা শুধু আইনি ক্ষেত্রে নয়, দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও। আদালতের এ নির্দেশ ইসরায়েলের মিত্রদের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের জন্য একটি পরীক্ষাও। আদালতের নির্দেশগুলো ইসরায়েল মানবে কী মানবে না, তা নির্ভর করছে এ দুই দেশের ওপর। তবে যুক্তরাষ্ট্র আইসিজেকে খাটো করে দেখে। জাতিসংঘের সাবেক মার্কিন দূত জিন কির্কপ্যাট্রিক যেমন এ আদালতকে বলেছিলেন, একটি আধা-আইনি, আধা-বিচারমূলক, আধা-রাজনৈতিক সংস্থা, যা কেউ কখনো গ্রহণ করে এবং কখনো করে না।

প্যাট্রিক উইনটোর লিখেছেন, ‘বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এটি বিখ্যাত বিজয়, একটি মুহূর্ত, যা আগামী কয়েক দশক ধরে স্মরণ করা হবে। গাজার জনগণের দুর্দশার কথা খোলা আদালতে বর্ণনা করা হয়েছিল এবং বিশ্বাস করা হয়েছিল।’ তার মতে, এ ছাড়া আফ্রিকান দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমালোচনা করেছে। অভিযোগ ছিল, এ আদালত আপাতদৃষ্টিতে শুধু আফ্রিকানদের বিচার করে। এবার আইসিজের ওপর তাদেরও কিছু বিশ্বাস তৈরি হবে।