ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের ধোপাবিলা গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন। এবার সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি। ধানও পেয়েছেন প্রায় ৬০ মণ। বাজারে সেই ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২০ টাকা মণ দরে। অথচ তারই ভোটার আইডি কার্ড ব্যবহার করে একটি চক্র ১ হাজার ৪৪০ টাকা কেজি দরে সরকারের কাছে দুই টন ধান বিক্রি করেছেন।
তার আগে সোনালী ব্যাংকের কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখায় গত ২৪ মে একটি নতুন হিসাব খোলেন রুহুল আমিন। এদিনই ব্যাংক থেকে একটি এক পাতার চেক ইস্যু করে দেওয়া হয় এই কৃষকের হাতে। তাতে স্বাক্ষর করার পর সঙ্গী প্রতিবেশী চাচা আব্দুর রহমান চেকটি নিয়ে নেন। এ সময় আব্দুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর ভাতিজাসহ আরও তিন দলীয় কর্মী। তারা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে সিঁড়িতে এক হাজার টাকার একটি নোট রুহুল আমিনের হাতে দিয়ে চেকটি নিয়ে নেন। রহস্যময় এই ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে দেশ রূপান্তর। কথা বলে বোঝা যায়, কৃষক রুহুল আমিন শুধু জানতেন, সরকারের একটি লটারিতে এক হাজার টাকা পেয়েছেন, যা তোলার জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। তার আগে এই কৃষকের ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে কৃষি অফিসে জমা দিয়েছিলেন আব্দুর রহমান। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য কৃষি অফিসের লটারিতে ১৬০১ নাম্বার সিরিয়ালে নিবন্ধিত কৃষক রুহুল আমিনের নাম আসে। কিন্তু এসবের কিছুই জানতেন না এই কৃষক। আব্দুর রহমান তাকে শুধু জানান, সরকারের একটি লটারিতে তার নাম উঠেছে এক হাজার টাকা পাওয়ার। সে কারণেই সোনালী ব্যাংকে হিসাব খুলে সেদিন এক হাজার টাকা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে আছে, সোনালী ব্যাংকের উল্লিখিত শাখায় শুধু রুহুল আমিনই নন, গত মে মাসের ২০ তারিখের পর থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩০০ জনেরও বেশি কৃষক ১০ টাকার একটি করে নতুন হিসাব খুলেছেন। কেউ কেউ না জেনে এবং কেউ জেনেই এই ফাঁদে পড়েছেন। এদের বেশিরভাগই এক-দুই হাজার টাকা করে নগদ পেয়েই সন্তুষ্ট; কিন্তু তারা জানতে পারেননি, তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেয়েছে একটি সুবিধাভোগী চক্র। কৃষকদের নাম ব্যবহার করে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে লাভবান হয়েছে প্রভাবশালী চক্রটি।
অনুসন্ধান বলছে, সরকারের ঘরে ধান বিক্রির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে কৃষক ঠকানোর এই কাজ চলে আসছে বছরের পর বছর। আর এই প্রতারণার সুযোগ করে দিয়েছে সরকারেরই বেঁধে দেওয়া এক মাপকাঠি ধানের ময়েশ্চার বা আর্দ্রতার মানদ-। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী দালালগোষ্ঠী ও খাদ্য অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই প্রতারণার কৌশলটি জিইয়ে রেখেছেন মিলেমিশে।
এই কারণে রুহুল আমিনের নামে বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীর লোকজন কোটচাঁদপুর খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৪৪০ টাকায়, যখন রুহুল আমিন নিজের জমির ধান স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২০ টাকা মণ দরে।
জানতে চাইলে আব্দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর জন্য এই কাজ করে দিয়েছি। একই দলের লোক হওয়ায় কাজটি করেছি; এখানে আমার কোনো স্বার্থ ছিল না। কৃষক রুহুলের অ্যাকাউন্ট খোলার দিনেই ব্যাংকের চেকটি লিয়াকত আলীর কর্মী যারা সেখানে ছিলেন, তারা নিয়ে গেছেন।’
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানের খবর খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা ও লিয়াকত আলীর কানে যাওয়ার পর থেকেই রুহুল আমিনের বাড়িতে পরপর তিনদিন ৫ থেকে ৬ জন করে ব্যক্তি হাজির হয়েছিলেন কিছু কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য। রুহুল আমিন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাড়িতে খাদ্যগুদামের লোকজন ও নেতাকর্মী মিলিয়ে ৬ জনের একটি দল এসেছিল। সরকারি কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে তাতে একটি সই দিতে বলেন। বারবার বলেছেন ঝামেলা মিটিয়ে ফেল কিছু টাকা নাও। কিন্তু আমি রাজি হইনি।’
তিনি জানান, এদের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রতিবারই অনুরোধ করেছিলেন প্রতিবেশী চাচা আব্দুর রহমান।
কোটচাঁদপুরের সরকারি খাদ্যগুদামের নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, যারা ধান বিক্রি করেছেন, তালিকায় তাদের নামের পাশে শুধু সিরিয়াল নাম্বার ও টিক চিহ্ন বসানো আছে; কারও কোনো সই বা আঙুলের ছাপ নেই।
কোটচাঁদপুর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জামশেদ ইকবালুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি রুহুল আমিনের বাড়িতে স্বাক্ষর আনার জন্য লোক পাঠানোর খবরটিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন এবং এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে চেয়েছিলেন বিকাশ নাম্বার।
বিএনপি নেতা লিয়াকত বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি ধান বিক্রির বিষয়ে কিছু জানি না।’
হয়রানিতে কৃষক, প্রতিবেদককে ঘুষের প্রস্তাব
কথা হয় ওই সোনালী ব্যাংকে হিসাব খোলা কোটচাঁদপুরের দোড়া ইউনিয়নের আরেক কৃষক মহিরউদ্দীন ম-লের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, লটারিতে তার নাম উঠেছে এবং তিনি ২ টন ধান বিক্রির কোটা পেয়েছেন। তবে এই ধান দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন তার প্রতিবেশী চাচা সিদ্দিকুর রহমানকে, যিনি স্থানীয় ইউনিয়নের বিএনপির পদধারী নেতা। তিনি প্রতিটি মৌসুমেই ধান ও পাট কিনে মজুদ করেন এবং পরে বেশি দাম দিয়ে বিক্রি করেন।
এই অবস্থা শুধু কোটচাঁদপুরের নয়, সারা দেশের।
চাঁদপুরের মতলব উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণের দুটি খাদ্যগুদাম সূত্রে জানা যায়, যেসব কৃষকের নাম লাটারিতে উঠেছে, তারা ধান দিতে গিয়ে নানা হয়রানিতে পড়ছেন। নির্দিষ্ট পরিমাণে ঘুষ না দিলে নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের ধান নেওয়া হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো কৃষক জানেনই না, তাদের নামে অন্য কেউ ধান বিক্রি করে গেছেন।
উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষক তানভীর হোসেন বলেন, লটারিতে নির্বাচিত হয়ে ধান বিক্রির জন্য গুদামে নিয়ে গেলে ময়েশ্চার ও চিটার পরিমাণ বেশি বলে জানান কর্মকর্তারা।
পরে অবশ্য সহযোগিতা করার কথা বলে এগিয়ে আসেন মতলব উত্তর খাদ্যগুদামের অফিস সহকারী সাদ্দাম হোসেন। তিনি নগদ সাড়ে ৫ হাজার টাকা নিয়ে ৭৫ মণ ধান বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন। তবে তার কাছে আরও বেশি টাকা চাওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার পর ধান বিক্রিতে তার আর কোনো অসুবিধা হয়নি। একইভাবে ফরাজীকান্দি ইউনিয়নের কৃষক হাফেজ বিল্লাল হোসেনের কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছে ছয় হাজার টাকা।
কৃষকদের কাছ থেকে এসব ঘুষের টাকা নগদে হাতে হাতে নেওয়া হয়েছে বলে কোনো প্রমাণ রাখা হয়নি। লেবার খরচ, বস্তার খরচ ও অফিসের অন্যান্য খরচের কথা বলে এসব টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ যারা ধান বিক্রি করবেন, তাদের জন্য সবমিলিয়ে ৫৪০ টাকার একটা সরকারি ফি নির্ধারণ করা আছে।
মতলব উত্তর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসমান গনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে টাকাটা নেওয়া হয়েছে সেটা সরকারের ভ্যাট, আইটি ও লেবার খরচ। এক্ষেত্রে অফিস সহকারী যদি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই অবস্থা মতলব দক্ষিণের। এখানে আবার লটারি হয়নি। কৃষি অফিসের প্রত্যয়নের মাধ্যমে ধান নেওয়া হয়েছে। তবে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টা ওপেন সিক্রেট এখানেও।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) একরামুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩০০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া প্রত্যয়নপত্র দেখে ৪০০ জন কৃষকের কাছ থেকে। সরকার নির্ধারিত ভ্যাট (আইটি) ছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়নি। কোনো কৃষক যদি অফিস সহকারীকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে থাকেন, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বক্তব্য দেওয়ার এক পর্যায়ে গুদামের এই কর্মকর্তা কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই এই প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং এই বিষয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
ধান বেচেছেন দলীয় লোকেরা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবার দলীয় স্লিপ ছাড়া কৃষক ধান বিক্রি করতে পারেননি মেহেরপুরে। সংশ্লিষ্ট মহলগুলোতে খেঁাঁজখবর নিয়ে কিছু হিসাব মোটামুটি নিশ্চিত করা গেছে। যেমন, এখন পর্যন্ত মেহেরপুর সদর উপজেলায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কমবেশি ৪০০ টন, জামায়াতের নেতাকর্মীরা ২০০ টন এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশ ৮ টন ধান বিক্রির সুযোগ আদায় করেছেন। আর কৃষকরা ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন ৫০ টনের বেশি নয়।
একইভাবে গাংনী উপজেলায় বিএনপি ৫০০ টন, জামায়াত ৩০০ টন, এবং ১৬ টন সাংবাদিক কোটায় গোডাউনে বিক্রি হয়েছে। মুজিবনগর উপজেলায় বিএনপি ২৫০ টন, জামায়াত ১০০ টন, সাংবাদিক কোটায় ৮ টন আর কৃষকের কাছ থেকে ৫০ টন ধান কিনেছে সরকার। কিন্তু খাতা-কলমে দেখানো হয়েছে কৃষকের দীর্ঘ তালিকা। যেটুকু ধান কৃষক দিয়েছেন, তার জন্য নেতাদের কাছ থেকে নিতে হয়েছে বিশেষ স্লিপ যা ছাড়া কর্মকর্তারা ধান নেননি।
কৃষক নাসির হোসেন ও হাসান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, খোলাবাজারে যখন ধানের কেজি ২৬ থেকে ২৮ টাকা ছিল নেতারা সেই ধান কিনে সরকারি গোডাউনে ৩৬ টাকায় বিক্রি করেছেন।
তাদের মতো বহু কৃষক ও বিভিন্ন মহলের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে সরকারি গুদামে ধান বেচাকেনা হয়েছে মেহেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ও সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম, গাংনী পৌর বিএনপির সভাপতি মকবুল হোসেন মেঘলা এবং মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে মেহেরপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আরশেদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি চেয়ারে বসে অনেক কিছুই বলা যায় না। এসব কাজে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ থেকে কেউই পিছপা হয় না। আমাদের প্রশ্ন না করে অনুসন্ধান চালান, সব তথ্য পেয়ে যাবেন। খামোখা আমাদের চাকরির ঝুঁকি বাড়াবেন না, প্লিজ!’
অনুসন্ধান করতে গিয়ে জামালপুরের সড়িষাবাড়ী উপজেলার ধান দেওয়া কৃষকদের তালিকায় ২ নম্বর পোগলদীঘা ইউনিয়নের কৃষক দলের নেতাকর্মীদের নাম পাওয়া গেছে। লটারিতে তালিকাভুক্ত হওয়া কৃষকদের হয়রানির বিষয়টিও পাওয়া গেছে। তালিকায় অনেকের নাম পাওয়া গেছে, যারা মূলত ফড়িয়া এবং পাইকারি বিক্রেতা। কেউ কেউ আবার ব্যবসায়ী। যেমন, পিংনা ইউনিয়নের বালুর ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী মো. খোকন মিয়া ৩ টন ধান বিক্রির কোটা পেয়েছেন। আরও পেয়েছেন তার আপন ভাই মো. শফিকুল ইসলাম ও চাচাত ভাই ইসমাইল হোসেন। পোগলদীঘা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান ফরহাদ এবং সড়িষাবাড়ী উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক মো. আব্দুল মজিদও তিন টন করে ধান বিক্রির কোটা পেয়েছেন।
ময়েশ্চার-চিটার ফাঁদ
ধান বেচাকেনার কঠিন শর্ত রয়েছে। সরকার যে ধানটা কেনে, তাতে ১৪ শতাংশের বেশি ময়েশ্চার বা আর্দ্রতা থাকা যাবে না। কিন্তু কৃষকের হাতে এমন কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তি দেওয়া হয়নি যা দিয়ে কৃষক নিজে বা অন্য কোনো স্থান থেকে ধানের ময়েশ্চার মাপতে পারবেন। ফলে অনেকেই হয়রানির শিকার হন খাদ্যগুদামে ধান দিতে গিয়ে। সংগ্রহকারী কর্মকর্তা যদি বলেন, ময়েশ্চার বেশি তাহলে আর কৃষকের করার কিছু থাকে না; তাকে ফেরত যেতে হয়। অবৈধ লেনদেনে কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এটার বৈধতা মেলে। একই অবস্থা চিটার ক্ষেত্রেও। শর্ত হলো ধানে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি চিটা থাকা যাবে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই শর্তটাও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় কৃষককে হয়রানি করার জন্য। এর সঙ্গে আরেক শর্ত হলো ভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ৮ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না। ধান কেনায় জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাইলেই এসব শর্তের ফাঁদে ফেলে হয়রানি করতে পারেন কৃষকদের। কারণ চিটা ও মিশ্রণের পরিমাণ নির্ণয় হয় চোখের দেখায়।
ময়েশ্চার (আর্দ্রতা) মাপার যন্ত্র ময়েশ্চার মিটার নামেই পরিচিত। এতে ধানের নমুনা দেওয়া হলে তাতে কতটুকু আর্দ্রতা রয়েছে, তা মিটারে উঠে আসে। প্রতিটা ক্রয়কেন্দ্রে এই যন্ত্র থাকে। এটা একটা লম্বাটে বাক্সের মতো দেখতে। এক পাশে ধান দেওয়ার খোপ এবং অন্যপাশে ডিজিটাল মিটার। এই প্রক্রিয়াটা বাংলাদেশ ও ভারতে একই রকম।
খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি আরেক বিস্ময়কর তথ্য দেন। বলেন, চিটা ও অন্য ধানের মিশ্রণ মাপার জন্য কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। চোখের দেখায় সেটা নির্ধারণ করা হয়।
আর গুদামের দুর্নীতিবাজ কর্মীদের কাছে এই ‘চোখের দেখা’ যে কী ভয়ংকর অস্ত্র, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই যে শর্তের মারপ্যাঁচে পড়ে কৃষক হয়রানি হচ্ছেন, তার বিস্তারিত উঠে এসেছে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) এক গবেষণায়। গত বছরের ৩০ জুন গবেষণাটি শেষ করা হলেও সেই গবেষণা প্রতিবেদন এ বছরের জুনের শেষ নাগাদ এফপিএমইউ-এর ওয়েবসাইটে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর আগে সেটা ছিল ফাইলবন্দি।
‘বাংলাদেশে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ ব্যবস্থা : চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই গবেষণায় ধান সংগ্রহে সরকারের কঠিন শর্তগুলোকে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে সরকারি ধান সংগ্রহ কেন্দ্রে বেসরকারি বাজারের তুলনায় কম সুবিধা প্রদান; ধানের গুণগত মান সংক্রান্ত কঠোর শর্ত যেমন আর্দ্রতার মাত্রা এবং চিটা ধানের (শুধু খোসাযুক্ত বা চালবিহীন ধান) সীমা; ধান শুকানো ও পরিষ্কারের পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব; পরিবহনব্যবস্থা ও সড়ক যোগাযোগের দুর্বলতা; সংগ্রহ কেন্দ্রের স্বল্পসংখ্যা ও দূরত্বজনিত সমস্যা; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্র্মে কৃষকের অ্যাপ ব্যবহারে অদক্ষতা এবং ধান বিক্রির অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও ঝুঁকি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারের ঘরে ধান বিক্রি করা কৃষকদের মধ্যে ১৮ শতাংশই অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। এসবের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন নেওয়া এবং অদৃশ্য বা অনানুষ্ঠানিক খরচ দাবি করার মতো বিষয় ছিল, যা তাদের খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে নিরুৎসাহিত করেছে। তবে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
গবেষণা প্রতিবেদনে ধান সংগ্রহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও কৃষকবান্ধব করার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে আর্দ্রতা ও চিটা ধানের গ্রহণযোগ্য মানে ছাড় দেওয়া। গবেষণায় মতামত প্রদানকারী অনেকেই আর্দ্রতা ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একইসঙ্গে ১৪ শতাংশের বেশি আর্দ্রতাসম্পন্ন ধান নিলে আর্দ্রতার পরিমাণ অনুযায়ী দাম নির্ধারণের কথাও সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া বেসরকারি স্থানীয় বাজারের মতো ধান সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ করা; চিটা ধানের গ্রহণযোগ্যতার মান কিছুটা শিথিল করা; সংগ্রহ কেন্দ্রে ধান শুকানোর যন্ত্র স্থাপন করা; অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে অস্থায়ী সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা; পরিবহন সুবিধা বা পরিবহন ব্যয় সহায়তা প্রদান; এলএসডি বা ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারে সহায়তাসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সম্প্রসারণ; অর্থপ্রদানের পদ্ধতি আরও সহজ করা; এবং বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করার সুপারিশও আছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ধান বিক্রি করতে চাওয়া কৃষক নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং হয়রানির স্বীকার হচ্ছে এটা সত্য। এজন্য প্রক্রিয়াটাকে সহজ এবং স্বচ্ছ করার জন্য প্রতিনিয়ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যেসব কর্মকর্তার অনিয়মে জড়িত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও নিয়মিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
তিনি বলেন, ব্লক সুপারভাইজারদের (কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা) যারা আছে তাদের কাছে যদি একটা করে ময়েশ্চার মাপার যন্ত্র দেওয়া যায়, তাহলে কিন্তু কৃষকের ভোগান্তি কমানো সম্ভব। এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। তবে ইউনিয়নগুলোতে বাজার ধরে ধান কেনার বুথ করার মতো পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই। যদিও এটা করা গেলে কৃষকের ভোগান্তি কমবে এবং প্রকৃত কৃষককে তখন ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। আর ভারতের মতো করে মৌসুমের শুরুতে আমরা ধান কেনার মূল্যটা আগে ঘোষণা করা যায় কি না সে বিষয়ে অধিদপ্তর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।
গবেষকরা জানান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারিভাবে ধান কেনার সময় স্থানীয় বাজারগুলোতে অস্থায়ী ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। তারা আর্দ্রতার ক্ষেত্রেও ছাড় দেন। ১৭ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতাসমৃদ্ধ ধান সরকারিভাবে কেনা হয়। তারা লটারি করেন না, বরং সহজ একটি ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে নিবন্ধনের মাধ্যমেই একজন কৃষক তার ধান সরবরাহের সময় ও তারিখ জেনে যান। নির্ধারিত সময়ে এসে তিনি ধান বিক্রি করেন এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পেয়ে যান।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মকর্তারা যাতে এই ক্রয় প্রক্রিয়াটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন সে জন্যই শর্ত সহজ করেন না। কারণ এখান থেকে অনেকেই লাভবান হন এবং হচ্ছেন। তবে সরকার চাইলেই ভারতের মতো করে শর্তগুলো সহজ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘শর্ত শিথিলের সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সংগ্রহ কেন্দ্র। দূরত্ব বেশি হওয়ায় অনেকে নির্দিষ্ট গুদামে ধান দিতে যান না। এ জন্য ধান কেনার মৌসুমে স্থানীয় বাজারগুলোত অস্থায়ী সংগ্রহ কেন্দ্র চালু করা জরুরি। সেখানে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে। তাহলে কৃষক বাজারে ধান নিয়ে গেলে সরকারের কাছে বিক্রি করবে এবং বাজারেও ধানের দাম সরকারি মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধান কেনার বিষয়গুলো আরও কীভাবে স্বচ্ছ ও সহজ করা যায়, সে বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে করে কৃষকের বঞ্চনা দূর হয়।
কৃষক ঠকানোর চক্রান্ত
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘খাদ্য ব্যবস্থাপনা নীতি’ বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খাদ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে শুরু করে একেবারে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের কারোরই সদিচ্ছা নেই বিষয়টি সমাধানের। কারণ অনেকেই এখানে সুবিধাভোগী।’
খাদ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তারা এবারও কৃষক ঠকানোর আয়োজন করেছিলেন; যদিও শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এমনই এক ঘটনার বিষয়ে জানা গেছে। গত ১০ জুন এফপিএমসি সভার আয়োজন করা হয়। সরকারের খাদ্যশস্য সংক্রান্ত যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এটি সর্বোচ্চ কমিটি। এই কমিটির আগের সভায় চলতি মৌসুমে ৫ লাখ টন ধান এবং ১৩ লাখ টন সেদ্ধ ও আতপ চাল কেনার ঘোষণা দেওয়া হয়।
কিন্তু সভায় অংশ নেওয়া একাধিক চক্রান্তকারীর উদ্দেশ্য ছিল, ৪ লাখ টন ধানের ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করে পরে মিলারদের কাছ থেকে আনুপাতিক হারে চাল কেনার পরিকল্পনা নেওয়া। সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কৃষক ঠকানোর এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘জুন-জুলাই মাসে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার বিকল্প নেই।’
জানা গেছে, পরে এই কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এই সিন্ডিকেটের বিষয়টি আঁচ করতে পারেন এবং প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন।
ওই সভার কার্যবিবরণী ঘেঁটে দেখা যায়, ওই প্রস্তাবটি খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারি করেছিলেন। অন্যান্য বছরের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি বলেন, ‘আগামী ৩১ আগস্ট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান কেনা না হলে পরে তা অনুপাতিক হারে চালের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।’
তবে এ বছর সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই ধান কেনা শেষ করেছে এবং তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধান কিনেছে। তবে অনুসন্ধান বলছে এবারে নেতাকর্মীরা বেশি ধান বিক্রি করেছেন বলেই দ্রুত কোটা পূরণ হয়েছে।