ছাইয়ের নিচে চাপা তদন্ত প্রতিবেদন!

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩১ এএম

চলতি বছরের ৫ জুন রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর আগে গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুরে কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে অগ্নিকান্ড ঘটে। কিন্তু কার্গো ভিলেজে এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য অজানাই থেকে যাচ্ছে। বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও এর রহস্য ঢেকে যাচ্ছে ছাইয়ের নিচে। ঘটনার পর একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়। তবে কোনো প্রতিবেদনই দেখছে না আলোর মুখ। এই নিয়ে হচ্ছে আলোচনা ও সমালোচনা।

গত এক বছরের ব্যবধানে কার্গোতে একাধিক রহস্যময় অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। ওইসব ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাসখানেক আগে একটি সংস্থা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও শুধু সুপারিশেই সীমাবদ্ধ আছে। অথচ আগুন লাগার সময় গোয়েন্দারা বারবার বলে এসেছে এসব ঘটনার পেছনে অদৃশ্য শক্তির সম্পৃক্তা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বারবার অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি, মিলিয়ন ডলারের জাতীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা বা তার সুপারিশ বাস্তবায়নে এক ধরনের ‘রহস্যময়’ নীরবতা জনমনে ও ব্যবসায়িক মহলে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান গেটওয়ে হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের গুরুত্ব অপরিসীম। এখান দিয়েই প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ইলেকট্রনিকস, গার্মেন্ট কাঁচামাল, ফার্মাসিউটিক্যালস কেমিক্যালসহ জরুরি পণ্য দেশে আসে এবং রপ্তানি হচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি বারবার আগুনের কবলে পড়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে কার্গো ভিলেজের ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট সেকশনে লাগা ভয়াবহ আগুন শুধু ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতিই করেনি, বরং আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করেছে। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কিংবা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদন বাস্তবায়নে প্রতিটি শাখাকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্তে ধোঁয়াশার জন্ম : তদন্ত কমিটির প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে আগুনের মূল উৎস ও প্রাথমিক কারণ নির্ধারণ করা, নাশকতার আলামত বা ষড়যন্ত্র আছে কি না তা বের করা, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থা বা ব্যক্তিদের গাফিলতি চিহ্নিত করা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ দেওয়ার কথা। কিন্তু কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্টগুলো ঘিরে তৈরি হয় এক অনিশ্চয়তা ও রহস্য। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের মতে, তদন্তের এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে না। আবার প্রতিবেদন জমা হলেও তার বিষয়বস্তু বা মূল তথ্য জনসম্মুখে আনা হয় না। এটি কোনো শ্রেণিবদ্ধ সামরিক নথি না হওয়া সত্ত্বেও কেন তথ্য গোপন রাখা হয়, তা এক বড় প্রশ্ন। প্রতিটি আন্তর্জাতিক বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুনের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট’কে দায়ী করে দায় এড়ানোর চেষ্টা দেখা যায়। কার্গো ভিলেজের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। অথচ আধুনিক অগ্নিনির্বাপক-ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে শর্টসার্কিট প্রতিরোধে একাধিক সেফটি লেয়ার থাকার কথা। কার্গো ভিলেজের শেডগুলোতে কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য থাকে। অনেক সময় শুল্ক ফাঁকি, পণ্যের হিসাবের গরমিল বা কোনো চক্রের অবৈধ সুবিধা লোটার প্রমাণ ঢাকতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে কি না এমন নাশকতার সন্দেহ বারবার উঠেছে। কিন্তু তদন্ত কমিটিগুলো এসব দিক গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে কি না, তার স্পষ্ট উত্তর রিপোর্টে সচরাচর থাকছে না।

শতকোটি টাকার ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন : বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) তথ্যানুযায়ী, বিমানবন্দরে প্রতিকেজি পণ্য আমদানিতে শূন্য দশমিক ২৯ মার্কিন ডলার চার্জ আদায় করা হয়। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ১০ ডলার নেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, শূন্য দশমিক ১৯ ডলার নিচ্ছে বেবিচক। বিমানবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু বলেছেন, মালামালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করছে বিমান। তাদের ওপরে বেবিচক আছে। তাদেরই এটা নিরাপত্তা দিয়ে রাখার কথা। এজন্য তারা পণ্যপ্রতি আমাদের থেকে চার্জ নেয়। এখন ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তার মতোই আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীরও একই কথা। তারা বলেন, বারবার আগুন আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। আমাদের ক্ষতিপুরণ কে দেবে তা কেউ বলছে না।

যা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে : কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতে অগ্নিঝুঁকি কমাতে বেবিচকের তদন্ত কমিটি কার্গো ও কুরিয়ার এলাকায় অগ্নিঝুঁকি কমাতে ১৭ দফা সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে বৈদ্যুতিক স্থাপনার আশপাশে মালামাল রাখা, অনুমোদিত সীমার বাইরে বৈদ্যুতিক লোড ব্যবহার, নিম্নমানের কেব্ল ওয়্যারিং, বিপজ্জনক পণ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতিকে অগ্নিঝুঁকির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কার্গো ও কুরিয়ার ইউনিটগুলোতে দাহ্য ও বিপজ্জনক পণ্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) মানদণ্ড অনুযায়ী পৃথকভাবে সংরক্ষণ ও চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ডেটাবেজভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রধান ও বৈদ্যুতিক বিতরণ বোর্ড (এমডিবি ও এসডিবি), রোড লাইটসহ সব ধরনের বৈদ্যুতিক স্থাপনার অন্তত এক মিটারের মধ্যে কোনো মালামাল রাখা যাবে না। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগকে কার্গো ও কুরিয়ার এলাকার বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে বলা হয়। ওয়ারিং, কেব্ল, এমডিবি, এসডিবি, আর্থিং ও লাইটনিং প্রোটেকশন ব্যবস্থা প্রতি মাসে অন্তত এক থেকে দুবার পরিদর্শন; বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও আন্তর্জাতিক অগ্নিনিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী এসব পরীক্ষা করতে হবে।

তদন্ত কমিটি কার্গো গুদামে দীর্ঘদিন নিলামযোগ্য পণ্য পড়ে থাকাকে নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে এসব পণ্যের নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে বলেছে ঢাকা কাস্টম হাউজকে। প্রতিটি কার্গো ও কুরিয়ার ইউনিটে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এমন স্থানে রাখতে হবে, যাতে জরুরি অবস্থায় কনটেইনার বা তালাবদ্ধ স্থাপনার বাইরে থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়। ফায়ার সেফটি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়ার আয়োজন করতে হবে।

কার্গোর চার্জ বেশি, তার ওপর আগুন : কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরে লজিস্টিক অদক্ষতা ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। সীমিত স্থান ও অপর্যাপ্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার কারণে মালবাহী বিমানের পরিচালনাও সীমিত। এতসব সীমাবদ্ধতার পরও বিমানবন্দরে পণ্য পরিবহন খরচ অন্য দেশের তুলনায় বেশি। তারপর যদি আগুন লাগে তাহলে আমরা কোথায় যাব। বারবার বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে লাগার কথা না। কেউ না কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব থাকছে না। তারা আরও বলেন, আমাদের এখানে সবকিছুই বেশি। দিল্লি বিমানবন্দরে প্রতিকেজি পণ্যের জন্য চার্জ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ মার্কিন ডলার, কিন্তু শাহজালালে শূন্য দশমিক ২৯ মার্কিন ডলার। বর্তমানে বছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন পণ্য বিমানবন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। বিমান ছাড়া এমিরেটস এয়ারলাইনস, ক্যাথে প্যাসিফিক, কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইনস ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে কার্গো পরিবহন পরিচালনা করে।

বিল নিলেও মিলছে না পণ্য : বেবিচক সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুল অঙ্কের পণ্য পুড়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে গার্মেন্টস রপ্তানির চালান, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের কয়েকশ শিপমেন্ট। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও বড় আঘাত। উড়োজাহাজ থেকে কার্গো নামানো থেকে শুরু করে আমদানিকারকের হাতে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস (বিমান)। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য না তুললে প্রতিদিনের জন্য আলাদা ফিও নিচ্ছে তারা। বেবিচক বিমানবন্দরের মালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও কার্গো টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা তদারকি করে। এ জন্য বিমানবন্দর ব্যবহার, নিরাপত্তা যাচাই, স্ক্যানিং ও পার্কিং চার্জ নেয় বেবিচক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত