সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী কমবে শীতের দাপট

দেশের চার বিভাগ ও তিন জেলায় তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বইছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও বাড়ছে। অনেক জায়গায় শৈত্যপ্রবাহ প্রশমিত হওয়ার পূর্বাভাসও রয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তথ্যের ভিত্তিতে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, উত্তরের তাপমাত্রার ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতি অন্য জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে শীতের দাপট কমে আসবে।

পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে গতকাল ছিল তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যথাক্রমে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সৈয়দপুরেও ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার পারদ নেমে যায়। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের এলাকাগুলোর মধ্যে তেঁতুলিয়া সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্য সব জায়গায় ২০ ডিগ্রির ওপরে ছিল। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে সীতাকুন্ড ও টেকনাফে।

দীর্ঘদিন আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা আবহাওয়াবিদ কামরুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শীতের তীব্রতা এখন ধীরে ধীরে কমে আসবে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যত কমই হোক, কোনো সমস্যা নেই। কারণ সূর্যের আলো পড়ছে বলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। আর রাতের যে সময়ে তাপমাত্রা কমে, তখন মানুষ লেপ বা কম্বলের নিচে থাকে।’

তাহলে কি চলমান শৈত্যপ্রবাহ শেষের দিকে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন সারা দেশেই তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। তবে আগামী বৃহস্পতি বা শুক্রবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটু বৃষ্টি হতে পারে, বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কমলেও শীতের তীব্রতা বাড়বে না।’

জানুয়ারি দেশের সবচেয়ে শীতলতম মাস, এখন থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে কি শৈত্যপ্রবাহ আর হতে পারে? এর উত্তরে আবহাওয়াবিদ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আরও একটি শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। তবে এতে শীতের তীব্রতা বাড়ার শঙ্কা নেই। কারণ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেশি থাকবে।’

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কেন্দ্র থেকে যেসব আবহাওয়াবিদ পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন তাদের মধ্যে ওমর ফারুকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘জানুয়ারি মাসজুড়ে স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা পড়বে। দেশের ১২ মাসের মধ্যে এ মাসটি সবচেয়ে শীতলতম। তবে এখন থেকে শীতের তীব্রতা কমে আসবে এবং বাড়তে থাকবে তাপমাত্রা।’

এবারের আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মৌসুমের প্রথম মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয় ৩ জানুয়ারি থেকে। সেই যে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হলো মাস জুড়ে দেশের কোথাও না কোথাও শৈত্যপ্রবাহ ছিল। তবে মাসের দ্বিতীয়ার্ধের আগ পর্যন্ত দেশে মাঝারি আকারের শৈত্যপ্রবাহ দেখা যায়নি। তৃতীয়ার্ধে উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। কিন্তু শৈত্যপ্রবাহ ছাড়াই প্রায় সারা দেশেই শীতের অনুভূতি বেশি ছিল।

এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, এবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় সারা দেশে শীতের অনুভূতি বেশি ছিল।

জানুয়ারির বেশির ভাগ সময় অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না নামলেও দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কম ছিল, তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার এটাও একটা কারণ বলে জানান আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়ার এই বৈপরিত্য কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি জোয়ার চলছে। দেশের শীতের এই পরিবর্তন নিয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে অতীতের তথ্য-উপাত্তের আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে।’

গতকাল ঈশ্বরদিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৯, রাজশাহীতে ৭, চুয়াডাঙ্গায় ৭ দশমিক ১, নীলফামারীর ডিমলায় ৭ দশমিক ২, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৭ দশমিক ৩, যশোরে ৭ দশমিক ৬, গোপালঞ্জ ও নওগাঁর বাদলগাছীতে ৮, সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ৮ দশমিক ৫, শ্রীমঙ্গলে ৮ দশমিক ৪, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও বগুড়ায় ৮ দশমিক ৫, খেপুপাড়ায় ৮ দশমিক ৭, মাদারীপুর ও বরিশালে ৮ দশমিক ৮, টাঙ্গাইলে ৯, ভোলায় ৯ দশমিক ২, রাঙ্গামাটিতে ৯ দশমিক ৫, সাতক্ষীরা ও ফরিদপুরে ৯ দশমিক ৬, সীতাকু-ে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সাধারণত কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়।

আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম শহীদ জানান, তীব্র শীত ও কুয়াশায় জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে। পঞ্চগড়ে এক দিন পর গতকাল আবার তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে বলে জানিয়েছে তেঁতুলিয়ার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্র।

গতকাল সকাল ৬টার দিকে তাপমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর ৯টার দিকে তাপমাত্রা কমে নেমে আসে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শুক্রবার তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাসেল শাহ এ তথ্য জানিয়ে বলেন, কুয়াশা কেটে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে।

সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের নোহলিয়াপাড়া, মালাদাম এলাকার বোরোচাষি আব্দুর রাজ্জাক, আমিনার রহমান, বরকত আলী জানান, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করেছেন তারা। কিন্তু বীজতলার অভাবে চারা রোপণ করতে পারছেন না। তীব্র শীত এবং ঘন কুয়াশার কারণে বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, চারা হলুদ হয়ে মরে যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে বোরোর বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা জামান চৌধুরী জানান, হাসপাতালে শীতজনিত রোগ নিয়ে প্রচুর রোগী আসছে; বিশেষ করে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছে অনেক শিশু।

জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে এ পর্যন্ত  কয়েক দফায় পাওয়া প্রায় ৩৬ হাজার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।

দিনাজপুর প্রতিনিধি কুরবান আলী জানান, দিনাজপুরের তাপমাত্রা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের পর এবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়েছে দিনাজপুর। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এ জেলার জনজীবন।

গতকাল সকাল ৯টায় দিনাজপুরে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে; যা এই মৌসুমে দিনাজপুরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।

দিনাজপুর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের আবহাওয়া সহকারী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, তাপমাত্রা কমতে কমতে দিনাজপুরের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও এবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়েছে; যা আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।