জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাজ ওই জেলার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন করা, শিক্ষকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করা। কিন্তু সেগুলোর কোনো কিছুই না করে শিক্ষকদের ব্যবহার করে নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করেছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন। তিনি এ বছর ৩০০ টাকা করে এক সেট ডায়েরি ছাপিয়ে প্রতি স্কুলে তা ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। শিক্ষকদের সেই ডায়েরি কিনতে বাধ্যও করা হয়েছে। প্রশ্ন ছাপানোর ব্যবসাও করেন তিনি। স্কুলে পরিদর্শনে গেলে তাকে দিতে হয় সম্মানী। এমনকি ক্লাস্টার মিটিংয়ে খাবারসহ অন্যান্য আয়োজন বাদে প্রত্যেক শিক্ষককে এক হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।
জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সারা বছরের বিভিন্ন ধরনের তথ্য একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করার নির্দেশনা রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের। ফলে আগে থেকেই স্কুলগুলো প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বিষয়ের একটি খাতা বানাতে হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের নাম, রোল ছাড়াও বছরে তাদের মূল্যায়ন লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু এ সুযোগে মুন্সীগঞ্জে সম্প্রতি যোগদান করা ডিপিইও এক ধরনের বাণিজ্য খুলে বসেন। তিনি প্রত্যেক বিষয়ের জন্য খাতার মতোই একটি ডায়েরি বানান, যা প্রত্যেক স্কুলকে কিনতে বাধ্য করা হয়।
শিক্ষকরা বলছেন, পাতলা খাতার মতো ছয় বিষয়ের এই ডায়েরির সেট ছাপাতে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার বেশি লাগার কথা নয়। অথচ এই এক সেট ডায়েরি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে কিনতে বাধ্য করেছেন ডিপিইও। যেসব স্কুলে চার থেকে ছয়জন শিক্ষক, তাদের কমপক্ষে এক সেট ডায়েরি। আর যেসব স্কুল সাত থেকে নয় বা তদূর্ধ্ব শিক্ষক, তাদের কমপক্ষে দুই সেট ডায়েরি বাধ্যতামূলক কিনতে হয়েছে। আর এজন্য স্কুলের কোনো ফান্ড না থাকায় শিক্ষকরা চাঁদা উঠিয়ে এই ডায়েরি কিনেছেন। তবে মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাড়া অন্য কোথাও এ ধরনের ডায়েরির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬১০টি। এর মধ্যে চার শিক্ষকবিশিষ্ট ১৩টি স্কুল, পাঁচ শিক্ষকবিশিষ্ট ২১৩টি, ছয় শিক্ষকবিশিষ্ট ৬৮টি, সাত শিক্ষকবিশিষ্ট ১৫৪টি, আট শিক্ষকবিশিষ্ট ৬৮টি এবং ৯ বা তদূর্ধ্ব শিক্ষকবিশিষ্ট ৯৮টি স্কুল রয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, চার থেকে ছয় শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুলগুলোতে ২ হাজার ২০০ টাকা লাভ হিসেবে ডায়েরি থেকে আয় হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ টাকা। আর ৭ থেকে ৯ শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুল থেকে আয় হয়েছে ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। শুধু ডায়েরি বাণিজ্য থেকেই ডিপিইও আয় করেছেন প্রায় ২০ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ টাকা।
সূত্র জানায়, এই ডায়েরি বাণিজ্য করতে ডিপিইও ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তা ছাপিয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরের ইদ্রাকপুর ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখেন। সেখান থেকে স্কুলগুলোকে টাকা দিয়ে ডায়েরি নিয়ে যেতে বলেন। এ কাজে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সহায়তা করেন। এ ছাড়া অন্য উপজেলার কিছু শিক্ষকও ডিপিইওর এই অনৈতিক কাজে সহায়তা করেন।
নাম প্রকাশ না করে মুন্সীগঞ্জ সদরের একজন প্রধান শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ডিপিইও আসার পর আমরা সারাক্ষণই ভয়ে থাকি। কখন যে কার দোষ ধরবে তা বোঝার উপায় নেই। নানাভাবে টাকা আদায় করা হচ্ছে, কিন্তু কেউ মুখ খুললেই বড় বিপদে পড়ে যাবে। স্কুলগুলো ভিজিটে গেলে ডিপিইওকে সম্মানী দেওয়া এখন একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। ডায়েরি আমাদের কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রতি ক্লাস্টার মিটিংয়ের জন্যও টাকা রেডি রাখতে হয়।’
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলেছেন, এই ডিপিইও যোগ দেওয়ার পরই নিয়মবহির্ভূতভাবে জেলা শিক্ষা অফিসের দোতলায় একটি বড় রুম খালি করে তার বাসা বানিয়েছেন। সেখানে শ্রীনগর উপজেলার শিক্ষকদের ৫২ হাজার টাকার টেলিভিশন দিতে বাধ্য করেছেন। ডিপিইওর কোনো ধরনের সভা না থাকলে প্রায় প্রতি কর্মদিবসেই দু-তিনটি স্কুল ভিজিট করেন। তিনি স্কুলে গেলেই তাকে সম্মানী দিতে হয়। ছোট স্কুলে গেলে ২ হাজার আর বড় স্কুলে গেলে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়, যা শিক্ষকরা পকেট থেকে দেন। কোনো স্কুল যদি সম্মানী না দেয় তাহলে ওই স্কুলের শিক্ষকদের তিনি অফিসে ডাকেন এবং নানা ধরনের দোষ ধরে বড় ধরনের বিপদে ফেলেন। এজন্য ভয়ে সবাই সম্মানী গুছিয়ে রাখেন।
শিক্ষকরা জানান, মুন্সীগঞ্জ জেলায় ছয়টি উপজেলা রয়েছে। আর উপজেলাগুলোকে ৩৬টি ক্লাস্টারে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি ক্লাস্টারে দুই মাসে একবার উন্নয়ন সভা হয়। যেখানে প্রত্যেক স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকেন। এই ডিপিইও আসার আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ক্লাস্টার সভা হতো। কিন্তু এখন তা করা হচ্ছে ক্লাস্টারভিত্তিক কোনো এক স্কুলে। সেই সভা আয়োজন ও খাবার খরচ আগে থেকেই শিক্ষকরা বহন করতেন। এখন যুক্ত হয়েছে স্কুলপ্রতি এক হাজার টাকা। অর্থাৎ ৬১০ স্কুল থেকে প্রতি ২ মাসে ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা তোলা হয়, যা কোথাও খরচ করা হয় না। প্রধান শিক্ষকদের এই টাকা সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (এডিপিইও) মো. নজরুল ইসলামের হাতে দিতে হয়। এ ছাড়া আগে স্কুলগুলো ক্লাস্টার বা উপজেলাভিত্তিক প্রশ্ন প্রণয়ন করে ছাপালেও এখন জেলা শিক্ষা অফিসের তত্ত্বাবধানেই মূলত প্রশ্ন ছাপিয়ে দেয়। এতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকায় প্রশ্ন কিনতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বেশনাল ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেওভোগ ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইদ্রাকপুর ২নং মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পঞ্চসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি নিয়োগ-সংক্রান্ত ব্যাপারে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করেছে জেলা শিক্ষা অফিস। এমনকি একাধিক শিক্ষককে সামান্য অজুহাতে সাময়িক বহিষ্কার করে তাদের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে ডিপিইও মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডায়েরি শিক্ষকরা মিলে করেছেন। এখন তারা কত টাকা নিয়েছেন বা না নিয়েছেন সেটার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আর প্রশ্ন ছাপানো বা ক্লাস্টার মিটিংয়ের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লেষ নেই। এখন মিটিংয়ে গেলে বা স্কুল পরিদর্শনে গেলে তারা আপ্যায়ন করেন। সেখানে আমার কী বলার আছে? তবে আমি কোনো সম্মানী নিইনি। আমি অফিসের দোতলায় একটি রেস্টরুমে থাকি, এটা সত্য।’