সেবার মান বাড়িয়ে নতুন রূপে

বেদেদের হারিয়ে যেতে বসা ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। আট বছরের গবেষণা শেষে রচনা করেন ‘ঠার’ নামে একটি গ্রন্থ। এর মধ্য দিয়ে বিলুপ্তপ্রায় ভাষাটি ফিরেছে স্বমহিমায়। হাবিবুর রহমানের এমন অসংখ্য উদ্যোগ মনোবল জুগিয়েছে বেদে জনগোষ্ঠীসহ সমাজের পিছিয়ে পড়াদের। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট পরিচালনার গুরুদায়িত্ব তার কাঁধে। একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক হাবিবুর রহমান। এখন নিজের সবটুকু মেধা নিয়ে মজেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পরিবর্তনের নেশায়। কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৯৩ দিনেই দৃশ্যমান তার অসংখ্য উদ্যোগের ফল।

গ্রেপ্তার করা হয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে ছোট-বড় বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্তদের। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে আন্দোলনের নামে কতিপয় রাজনৈতিক দলের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রচেষ্টাও রুখে দিয়েছেন তিনি। গ্রেপ্তার করা হয় নাশকতা মামলার আসামিদের। কমিশনারের নেতৃত্বে কাজ করছেন রাজধানীর ৫০টি থানার পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশসহ (ডিবি) অন্য ইউনিটের সদস্যরা। থানাগুলোতে বেড়েছে সেবার মান। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়েছেন নানা পরিকল্পনা। সেবার মান আরও বাড়াতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে পুরো ডিএমপিকে।

পুলিশের এই অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পাশে থাকতে কৌশলী নানা সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন। রাজধানীর দীর্ঘদিনের সমস্যা যানজট দূর করতেও লেগে আছেন একনিষ্ঠভাবে। যানজট কমাতে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন পদক্ষেপ। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নগরবাসীর অভিযোগ সরাসরি জানাতে ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবা চালু করেছেন। যার মাধ্যমে নগরবাসী তাদের নানা সমস্যার কথা সরাসরি পুলিশ কমিশনারকে জানাতে পারছেন। পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এ সেবার মাধ্যমে নগরবাসী দ্রুত প্রতিকারও পাচ্ছেন।

এরই মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ৪৯ বছরে পা দিচ্ছে ডিএমপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সচিব ও পুলিশ প্রধানসহ ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত থাকবেন এ আয়োজনে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সেøাগান হলো ‘সেবা ও সদাচার ডিএমপির অঙ্গীকার’। মাত্র ১২টি থানা ও সাড়ে ৬ হাজার জনবল নিয়ে ১৯৭৬ সালে গঠিত হয় ডিএমপি। বর্তমানে থানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০টি। জনবলও বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমান জনবল প্রায় ৩২ হাজার। বাড়ানো হয়েছে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও। নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে পদোন্নতি। সব মিলিয়ে সার্বিক কর্মকাণ্ডে আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। জনবহুল রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অপরাধ দমনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে পুলিশের এই ইউনিট।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানাগুলোতে সেবার মান বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। ভালো কাজ করার জন্য সদস্যদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। তাদের জনবান্ধব করা হচ্ছে। থানায় গিয়ে কোনো নগরবাসী হয়রানির শিকার হওয়ার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

চৌকস এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা আরও বেশি আন্তরিক হয়ে কাজ করতে চাই। সেজন্য ডিএমপির সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহায়তার জন্য নানাভাবে মোটিভেশন (উজ্জীবিত) করা হয়েছে। তেমনিভাবে নগরবাসীর কাছ থেকেও প্রত্যাশা করছি, তারা যেন সব নিয়মকানুন মেনে চলেন এবং আমাদের সহযোগিতা করেন।’

জানা গেছে, ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেন হাবিবুর রহমান। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইনসের মেস, ব্যারাক ও ক্যান্টিন পরিদর্শন করেছিলেন। মেসে গিয়ে বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাবার খেয়ে খাবারের মান যাচাই করেন। এরপর পুলিশ সদস্যদের দেওয়া খাবারের মান ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়েছে। তাদের শারীরিকভাবে সুস্থ রাখতে নানা পরিবর্তন শুরু হয়েছে। অন্যদিকে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত পুলিশ সদস্য মো. আমিরুল ইসলামের মৃত্যুর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পেনশনের চেক ও আনুতোষিক সুবিধা পেয়েছে তার পরিবার। পেনশনের চেক, ভবিষ্যৎ তহবিলের জমাকৃত অর্থ ও ল্যামগ্রান্ডের সমুদয় অর্থ দ্রুত প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ডিএমপি কমিশনার।

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন কমিশনার দায়িত্ব পাওয়ার পর বেশ কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি থানাগুলোতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ মামলা বা জিডি হয়েছে কমিশনারের নির্দেশে সেসব মামলা-জিডি ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। মামলা করা বা জিডির বাদীর সঙ্গে কথা বলছেন ডিএমপি সদর দপ্তরের বিশেষ টিমের সদস্যরা। তাদের কাছে পুলিশের ঘুষ দাবি, দুর্ব্যবহার কিংবা মামলা নিতে হয়রানির কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা জানতে চাওয়া হচ্ছে। অনলাইনে জিডি বা মামলা করার প্রবণতা বেড়েছে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে পুলিশের অন্যতম শক্তিশালী ইউনিটে পরিণত হয়েছে ডিএমপি। যেখানে যোগ্যতম কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন। যোগ্যতা ও নেতৃত্বের গুণে তারা অনেক বেশি এগিয়ে। সৃজনশীল কর্মকৌশল কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন অপরাধের ধরন আবিষ্কার ও তা প্রতিরোধে কাজ করে চলেছেন এসব কর্মকর্তা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আধুনিকায়ন হয়েছে ডিএমপির অন্য ইউনিটগুলো।

জানা গেছে, ডিএমপি কমিশনারের বিশেষ সহকারীর নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জনের একটি দল থানাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করছে। যেসব থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর তাদের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারকে অবগত করা হচ্ছে। থানায় সাধারণ দুই ধরনের মামলা হয়। এক ধরনের মামলার বাদী পুলিশ। সাধারণ মানুষ বাদী হয়ে আরেকটি ধরনের মামলা করেন। সাধারণ মানুষের করা মামলার প্রত্যেকটির বাদীর সঙ্গে ডিএমপি সদর দপ্তরের টিম কথা বলেছে।

রাজধানীর নাগরিকদের সমস্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ফুটপাত দখল করে চলাচল অনুপযোগী করে রাখা। সম্প্রতি এই সমস্যার সমাধানে নেমেছে ডিএমপি। এরই মধ্যে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের ফুটপাত থেকে দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের ফুটপাত থেকেও দোকানপাট সরিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান ডিএমপি কর্মকর্তারা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় সর্বাত্মক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ডিএমপির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে তিন বছর মেয়াদি ‘ঢাকা রোড ট্রাফিক সেফটি প্রজেক্ট’ চলমান রয়েছে। জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে মিলে রাজারবাগ স্কুলে শিক্ষার্থীদের সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ কার্যক্রম আরও বেগবান করতে কমিশনার হাবিবুর রহমান সরাসরি তদারকি করছেন। এ ছাড়া রাজধানীর সড়কের যানজট দূরে তিনি নানা কৌশলী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন দিবসে কীভাবে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায় তা নিয়ে হাবিবুর রহমান সরাসরি তদারকি করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

সাধারণ ডায়েরি (জিডি), পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও সাইবার অপরাধ দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে ডিএমপি। কমিশনার হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সাইবার মনিটরিং ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাইবার গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ইউনিটের সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার জগৎ সম্পর্কে দক্ষ এমন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি থানায়। এ ছাড়া সিটিটিসির সাইবার ইউনিট সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ফলে সাইবার প্রতারণা কিংবা ভার্চুয়াল জগতের অন্য অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর দ্রুত সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঊর্ধ্বমুখী সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিজেদের সাফল্য দেখিয়েছে ডিএমপি। অন্যদিকে থানায় না গিয়েই প্রযুক্তির সহযোগিতায় অভিযোগ জানাতে পারছে সাধারণ মানুষ। অনলাইনে জিডির পর সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তারা দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বিদেশগামীদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট পেতে দীর্ঘ সময় আর অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। তারা খুব সহজেই আবেদন করতে পারছেন পুলিশের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে।

রাজধানীর নিত্য সমস্যা চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন হাবিবুর রহমান। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ অন্য অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। একসময় ছিনতাইয়ের হটস্পট হয়ে ওঠা এলাকাগুলো এখন অনেকটা নিরাপদ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলো ঘিরে গড়ে ওঠা চোর চক্রের বিরুদ্ধে টানা অভিযানের পর চুরির ঘটনাও কমে এসেছে।

ডিএমপির এই কমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পরই নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জে পড়েন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন যানবাহনে আগুন লাগানোর ঘটনায় জনমনে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক রোধে হাবিবুর রহমানের নেওয়া কৌশলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধ সম্ভব হয়েছে। নাশকতার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

রাজারবাগে সুধী সমাবেশ : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামীকাল সকাল ১০টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সুধী সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পীরা গান পরিবেশন করবেন।