ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান। তিনি অ্যাটাচড হয়েছেন শামসুন নাহার হলে। তবে হলের ভেতরে গিয়ে একটু সময় কাটানোর সুযোগ তার হয়নি। কারণ তিনি ওই হলের আবাসিক ছাত্রী নন, অ্যাটাচড মাত্র। তাকে গেটেই আটকে দিয়েছেন গার্ডরা। তাই হলের শিক্ষার্থী হয়েও নিজেকে বহিরাগতই ভাবছেন ইসরাত।
শুধু শামসুন নাহার হলেই এমনটা ঘটছে বা ঘটে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পাঁচটি হলেই ঘটে। অনাবাসিক ছাত্রীরা এমন নিষেধাজ্ঞায় পড়েন। আর এক হলের ছাত্রীর অন্য হলে প্রবেশ তো কোনোভাবেই নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসগুলোতে অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রবেশে মোটামুটি একই ধরনের সমস্যা বিরাজমান। হলের আবাসিক ছাত্রী ছাড়া নিজ হলে বরাদ্দ পাওয়া অনাবাসিক ছাত্রীরাও, এমনকি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য হলের ছাত্রীরাও প্রবেশের অনুমতি পায় না। গেস্টরুম এবং অফিসে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও ঢুকতে অনেক সময় গেটেই কাটাতে হয়, কর্মচারীদের হয়রানির শিকার হতে হয়।
অথচ ছেলেদের হলগুলোর অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। ছেলেরা চাইলে অনায়াসেই যেকোনো হলে ঢুকতে পারে। ছেলেমেয়ের এমন বৈপরীত্যের বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয় বা হল কর্তৃপক্ষের ‘তৈরি করা জবাব’ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, বিষয়টি মেয়েদের স্বার্থেই। ছাত্রীদের দাবি, বিষয়টি শিথিল করা হোক।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে দুপুরের খাবারের পর্যাপ্ত ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। দুপুরের খাবারের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসিক হলগুলো ছাড়া বিকল্প নেই। অথচ অনাবাসিক ছাত্রীদের নিজের হলেই ঢুকতে দেওয়া হয় না। নামাজের বেলায়ও একই সমস্যা। জরুরি প্রয়োজনে রাতে থাকতে চাইলে বাধা দেওয়া হয়। কোনো বন্ধু অসুস্থ হলে আরেক হল থেকে তাকে দেখতে আসা সম্ভব হয় না। অধিকার চাইতে গেলে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়।
নিজ হলে প্রবেশ করতে না পারায় হতাশা ব্যক্ত করে শামসুন নাহার হলের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভর্তি হওয়ার পর হল কার্ড করতে গিয়ে ভেতরে একটু দেখতে চেয়েছিলাম। গার্ডরা বলল, ভেতরে যাওয়া যাবে না। আবাসিক না হওয়া পর্যন্ত ভেতরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘লাঞ্চ টাইমে নিজের হলে অন্তত খেতে যেতে দেওয়া উচিত।’
জান্নাত নামে সুফিয়া কামাল হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিভাগের একটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে ফিরতে রাত হয়ে যাওয়ায় হলে থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আবাসিক কার্ড না থাকায় আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমার আবাসিক বন্ধু ভেতরে নিতে চাইলে তার সিট কাটা যাবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। গার্ডদের আচরণ খুবই খারাপ।’
হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আন্দোলনও করে শিক্ষার্থীরা। অনাবাসিক ও আবাসিক ছাত্রীরা আইডি কার্ড দেখিয়ে যেকোনো হলে ঢোকার সুযোগ এবং হলে ঢোকার সময়সীমা বাড়ানো প্রভৃতি দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এক হলের ছাত্রীর অন্য হলে প্রবেশ, নাম এন্ট্রি করে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হলে প্রবেশের সুবিধা, হয়রানি বন্ধ প্রভৃতি দাবিতে মানববন্ধনও করা হয়েছে।
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকা বিনতে হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়েদের হলগুলো নিয়ে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা আছে সেগুলোর নিরসন হওয়া উচিত। ছাত্রীদের যেকোনো হলে যেন ঢুকতে পারে তার ব্যবস্থা করা উচিত এবং প্রবেশে হয়রানি বন্ধ করা হোক। আশা করি, বর্তমান উপাচার্য বিষয়গুলো দেখবেন এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াবেন।’
শামসুন নাহার হলের শিক্ষার্থী তামান্না বলেন, ‘হলে প্রবেশের নিয়মটি অবশ্যই শিথিলতার দাবি রাখে। আইডি কার্ড চেকিং সাপেক্ষে হলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন। এটা অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রতি দয়া নয়, এটা তার নিজ হলে প্রবেশের অধিকারের বিষয়।’
রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী সানজানা বলেন, ‘নিয়মটি শিথিল করা জরুরি। আমরা সবাই এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী, কেউ বহিরাগত নয়। আমাদের সঙ্গে আচরণটাও তেমন হওয়া উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের পাঁচটি হল ভোর ৬টায় খোলা হয় আর রাত ১০টায় বন্ধ হয়। কোনো ছাত্রী জরুরি প্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করলে তিনি লেট পারমিশন নিতে পারেন। লেট পারমিশন থাকলে সর্বোচ্চ রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বাইরে অবস্থান করতে পারেন।
অভিযোগ রয়েছে, পলিটিক্যাল ছাত্রীরা (রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত) রাতে যেকোনো সময়ে প্রবেশ করতে ও বেরোতে পারে। তাদের বাধা দেয় না হল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারীরা। অন্যান্য সময়েও তারা চাইলে যে কাউকেই ভেতরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের এসব ব্যাপারে নানাভাবে হয়রান করা হয়।
হল প্রশাসনের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই এসব নিয়ম। প্রয়োজনসাপেক্ষে প্রবেশের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। অবাধ বিচরণের সুবিধা দেওয়া হলে শৃঙ্খলাভঙ্গের আশঙ্কা রয়েছে।
শামসুন নাহার হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল বলেন, ‘ছাত্রীদের হলগুলো খুবই নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়। অনাবাসিক ছাত্রীরা গেস্টরুম এবং অফিস পর্যন্ত আসতে পারে কিন্তু আবাসিক এলাকায় ঢুকতে পারে না। ঢুকতে দিলে প্রায়ই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। হলের পরিবেশের স্বার্থেই কিছু নিয়মের মধ্যে আমাদের চলতে হয়।’
সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী বলেন, ‘আবাসিক হলে আবাসিক ছাত্রীরাই থাকবে। অনাবাসিক ছাত্রীদের অবাধ বিচরণ করতে দিলে শৃঙ্খলাভঙ্গ হতে পারে। কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছেও। তবে খাওয়া ও অফিসে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার্ড জমা রেখে আমরা ঢুকতে দিই। পলিটিক্যাল মেয়েদের সুবিধা বেশি দেওয়া হয় এ কথা আমার জানা নেই। সব ছাত্রীই আমাদের কাছে সমান।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রয়োজনে বিষয়টি সভায় তোলা হবে, আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রাধ্যক্ষ স্থায়ী কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, ‘অফিস সময়ে অবশ্যই ছাত্রীরা হলে ঢুকতে পারবে। আর কীভাবে তাদের সুবিধা বাড়ানো যায় সে ব্যাপারে আমরা আলোচনা করব। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কারও খারাপ ব্যবহার মোটে কাম্য নয়। ছাত্রীরা এ ব্যাপারে তথ্য দিলে আমাদের হল প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেই হয়তো ছাত্রীদের হলগুলোতে এমন নিয়ম হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা আমরা দেখব। ছাত্রীরা যাতে প্রয়োজনে প্রবেশ করতে পারে তা নিয়ে প্রভোস্ট কমিটিতে আলোচনা করব। আশা করি, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারব।’