গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্নস্থানে একই পরিবারের তিন জনকে গলাকেটে হত্যা, একই ঘরে বাবা-ছেলের ঝুলন্ত লাশ, রান্না ঘরে মা ও গাছে ছেলের ঝুলন্ত লাশ, তিন সন্তানকে বিষ খাইয়ে মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টার মতো ঘটনা ঘটেছে। যা নিয়ে সারা দেশে আলোচনা হচ্ছে। এমনকি জনমনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ায় এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। পরকীয়া, সম্পত্তি ভাগাভাগি, মানসিকভাবে বিকৃতি, অর্থনৈতিক দীনতা পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। আবার অপসংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল বার্তা, খেলাধুলা কমে যাওয়া, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে এসব ঘটছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
জানা গেছে, মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) গোপালগঞ্জে বাবার একাধিক বিয়ে নিয়ে শাশুড়ির মানষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিজের হাতে ৩ কন্যা সন্তানকে বিষ খাওয়ানোর পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন পলি বেগম নামে এক গৃহবধূ। এ ঘটনায় বুধবার সকাল ৮টায় ছোট মেয়ে মীম মারা যায়।
অন্যদিকে ২৯ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সিরাজগঞ্জের তাড়াশে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ২৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার মঙ্গলবাড়িয়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে বাবা ও তার ৭ বছর বয়সী ছেলেকে পাশাপাশি রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে ছেলেকে হত্যার পর বাবা আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া গত ২৬ জানুয়ারি পাবনার চাটমোহরে রান্নাঘর থেকে মায়ের, আর ছেলের লাশ পাশের একটি গাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। হঠাৎ করে একসঙ্গে এতগুলো ঘটনায় দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এর পেছনের কারণগুলো নিয়ে।
এ বিষয়ে কথা হয় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা নানা কারণে ঘটে থাকে। এটা কেস টু কেস ভেরি করে। মানুষের মধ্যে হতাশা, পারিবারিক কলহ, ধৈর্য্যশক্তি কমে যাওয়া, অর্থ প্রাপ্তি বা নিজের সুবিধা নেওয়ার জন্য, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীনতার কারণে এ ধরনের হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ঘটছে। এগুলো দ্রুত বন্ধ করা মুশকিল।
তিনি আরো বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়। অস্থির সমাজে বসবাস করলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা থাকে। বর্তমানে সাংস্কৃতিক বিকৃতির কারণে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়া, সামাজিক বন্ধন নষ্ট হওয়া একটা বড় কারণ হিসেবে রয়েছে ঘটনাগুলোর পেছনে।
পুলিশের এই সাবেক আইজিপি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এগুলো মোকাবেলা করতে হবে। তাই সমাজের সকলে মিলে সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা কমানো যাবে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিক কেন্দ্রর (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ৫৭৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার এবং ১২৯ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর ৩৩ জন মারা গেছেন এবং ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে স্বামী কর্তৃক ২০৭ জন নারী মারা গেছেন এবং নির্যাতনে ১৪২ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ সময় ১৪২ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। গত বছর ৪৮৫ জন বিভিন্নভাবে শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
আসক'র নির্বাহী পরিচালক ফারুখ ফয়সল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি মনে করি আমাদের সমাজে একটা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ মানুষের এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই সামাজিক অস্থিরতা যদি দূর করা না যায় তাহলে মানুষ মানসিকভাবে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। এই সমাজকে যদি সৎ এবং সহনশীল সমাজে পরিণত করতে না পারি তাহলে এই অস্থিরতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে পড়া। এটা দুর্বল হওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে পারিবারিক পরিবেশে কোনো শৃঙ্খলা নেই। যেমন- পরকীয়া, সম্পত্তিগত বিষয়। পারিবারিক পরিবেশে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে কষ্টে সেটা বজায় থাকছে না। যার কারণে নিজেদের মধ্যে বন্ডিং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এ থেকে উত্তরণে সরকারের চেয়ে বড় দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে। সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবোধ বজায় রেখে চললে এটা কমানো সম্ভব। এখানে পরিবারকে সংযত হতে হবে এবং ব্যক্তিত্ববোধের জায়গা থেকে সবাইকে অন্যের এবং নিজের বিষয়গুলো বিবেচনাবোধ থেকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে এ ধরনের ঘটনা অনেক কমে আসবে।
মানবাধিকার কর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হচ্ছে তার পরিবার। কিন্তু সেই স্থানে এখন সম্পর্কের দুর্বলতা, লোভ, মানবিক মূল্যবোধের অভাব ঢুকে গেছে। এর পেছনে কারণ হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয় ও পারস্পরিক বন্ধন কমে যাওয়া। এজন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। এক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কাউন্সিলিং জরুরি। সবাই মিলে এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সম্বন্বিতভাবে কাজ করলে এ ধরনের ঘটনা কমবে বলে আশা করেন তিনি।