একটি আত্মহত্যার সংবাদ ও আমাদের ভাবনা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৫৬ পিএম

পত্রিকার পাতায় প্রায় সময় কিছু শিরোনাম চোখে পড়ে। “দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা শ্রমিকের”, “শারীরিক কষ্ট সইতে না পেরে বৃদ্ধার আত্মহত্যা”, “সিংগাইরে স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে স্বামীর আত্মহত্যা”, “স্বামী অনলাইন জুয়ায় আসক্ত, স্ত্রী ও ছেলের বিষপানে আত্মহত্যা”, “প্রথম স্ত্রী বিয়ে মেনে না নেওয়ায় স্বামী-স্ত্রীর আত্মহত্যা”, “মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ছেলের আত্মহত্যা”, “ঘরের আড়ায় ঝুলছিল ধর্ষণের শিকার সেই স্কুলছাত্রী”, জবি ছাত্রীর আত্মহত্যা”, “আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা”, “অভিমান আর বিষণ্ণতা থেকে আত্মহত্যা করলেন সংগীত শিল্পী”, এমন আরো অনেক সংবাদ।

এই প্রতিটা শিরোনামের পিছনে লুকিয়ে আছে কিছু নাম, কখনো ধ্রুবজিৎ কর্মকার, কোনো এক ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা, অথবা বহুল সুপরিচিত নাম সাদী মহম্মদ। 

একটু কি ধাক্কা খেলেন?

এইভাবে ভেবে দেখেছেন কখনো? এই মানুষগুলো কেন স্বেচ্ছায় হারালেন? ঘটনা ঘটে যাবার পর, আফসোস করা ছাড়া আমাদের আর কি করণীয়?

আসুন নিজেদের পাল্টাই।

প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য “আত্মহত্যার কাহিনী বদলে দিন”, যা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্তরে আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের ভাবনা, আলোচনা, এবং প্রতিক্রিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে একটি শক্তিশালী আহ্বান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বাংলাদেশে ২০১৮ সাল থেকে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এবং আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, হতাশা, সম্পর্কচ্ছেদ, পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা, মোবাইল আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব ইত্যাদি।

বাংলাদেশে আত্মহত্যা একটি গভীর তথ্য সংকটপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আত্মহত্যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ ও সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায়, আত্মহত্যার অনেক ঘটনা রিপোর্ট হয় না। “জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি, বাংলাদেশ‑২০২২" এবং "জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০–২০৩০” অনুযায়ী, যদিও বাৎসরিক আত্মহত্যার হার ৫%  হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; তবুও তা বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনো তৈরী হয়নি। তাই নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের অভাবে নীতি নির্ধারণে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

আমাদের উচিত, আত্মহত্যাকে অপরাধ বলার বদলে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা, যাতে চাপে থাকা যে কোনো ব্যক্তি সহানুভূতিশীল ও পেশাদার সহায়তা পায়। এই বছরের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের এমনসব ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে যেখানে একজন ব্যক্তি, তার সামাজিক অবস্থান ও পারিপার্শিকতার ভীতি কিংবা কষ্টের কারণে চুপ করে না থেকে স্বচ্ছন্দে নিজের মানসিক অবস্থার কথা জানাতে পারেন। 



মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান "শোনো" এর সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর, আখতার বানু শম্পা, জানালেন: “যদি আপনি মনে করেন, আপনার পরিচিত কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাহলে তার পাশে থাকার চেষ্টা করুন, তার কষ্টটি জানার চেষ্টা করুন, তার কথা বিচার না করে, সহানুভূতিশীল মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাকে বুঝতে দেন যে সে একা নয় এবং সহায়তা পাওয়া সম্ভব। দ্রুততার সঙ্গে সেই ব্যক্তির  বিশ্বস্ত কাউকে, যেমন: পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, চিকিৎসক বা পেশাদার কাউন্সেলরকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে হেল্পলাইনের সাহায্য নিন। আত্মহত্যার ঝুঁকির ক্ষেত্রে সময়মতো সহায়তা নেওয়া এবং দেয়াই পারে একটি জীবন বাঁচাতে।” 

আত্মহত্যাকে ঘিরে আমাদের যেই সামাজিক দ্বিধা, সেটি ঝেড়ে, এই বিষয়ে খোলামেলা কথোপকথনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে মত বিনিময়, থেরাপি, যোগাযোগ, সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক ওয়ার্কশপ, হটলাইন/হেল্পলাইন সেবার বিস্তৃতি ঘটাতে হবে, যেনো কেউ নিজেকে একা বা বিপর্যস্ত অনুভব করলে, সহজ ও অবিলম্বে সহায়তা পেতে পারে।

এই বিষয়ে, "শোনো" এর আরেক সংশ্লিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সালেহ সিদ্দিকী অনিক বলছিলেন: "বিশ্বব্যাপী ইয়াং এডাল্টদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ আত্মহত্যা। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিরাও। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মানসিক অসুস্থতা যার চিকিৎসা করা হচ্ছে না, হতাশা ও বিষন্নতা যা তীব্র আকার ধারণ করেছে, এই সব কিছুই আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। তীব্র সমস্যাগ্রস্থদের ক্ষেত্রে, কাউন্সেলিং এর পাশাপাশি মেডিকেশন ও  হসপিটালাইজেশনেরও প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতন এবং উদাসীন। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। বিগত ১৬ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সূচিকিৎসা এবং ইমপ্যাথেটিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রবণতাকে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু যত্নের, প্রয়োজন পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন। " 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে, জাতীয়ভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার "লিভ লাইফ" প্রতিরোধ পন্থার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে:

১. পোকামাকড়নাশক বিষ, প্রাণঘাতী ঔষধ ইত্যাদির সহজলভ্যতা সীমিতকরণ করা হয়।  

২. সাংবাদিকতা বা মিডিয়ায় আত্মহত্যা সংক্রান্ত তথ্য দায়বদ্ধতা ও সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন হয়।

৩. তরুণদের মধ্যে আবেগীয় ভারসাম্য, মানসিক চাপের লক্ষণ জানা ও চাপ মোকাবিলায় দক্ষতা গড়ে তোলা যায়। 

৪. আত্মহত্যা বা স্ব‑হানিকারী প্রবণতা শনাক্ত করা, দ্রুত সহায়তা, পরিচালনা এবং নিয়মিত ফলো‑আপ করা যায়। 

এর পাশাপাশি, কার্যকর প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন: প্রারম্ভিক শনাক্তকরণ, দপ্তরিক বিশ্লেষণ, মাল্টিসেক্টরাল সহযোগিতা, সচেতনতা এবং প্রচার, অর্থায়ন ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। 

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ২০২৫ এ আমরা অঙ্গীকার করি যে, মানসিক কষ্ট কোনো অপরাধ নয়, বরং আবেগীয় সঙ্কেত। আসুন, আমরা আমাদের চারপাশের সবার যত্ন নেই। অপরজনের অন্তরের কথা শুনি, হালকা দৃষ্টিতে নয়, সহানুভূতি সহকারে উত্তর দেই।  সকলের জন্য একটি নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ভবিষ্যতের জন্য আজ থেকে আত্মহত্যা নিয়ে প্রথাগত নিষ্ক্রিয়তার বর্ণনা বদলে দেই। 

আমাদের যেন কখনো কোনো স্বজন বিয়োগে বলতে না হয় ... "ইশশ। ... যদি একটু জানতাম" ...

লেখা: মেরিলিন আহমেদ, কো -ফাউন্ডার ও সি ই ও - শোনো, মানসিক স্বাস্থ্য কেয়ারলাইন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত