২০২৪ সালে বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার ৩১০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬১ শতাংশই নারী, মোট ১৮৯ জন। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দারা। আর আত্মহননের হার কম সিলেট বিভাগে।
শনিবার (১৮ জানুয়ারি) আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। দেশের ১০৫টি স্থানীয় এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। এতে ২০২২ ও ২০২৩ সালের তুলনামূলক তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০২২ সালে ৫৩২ জন এবং ২০২৩ সালে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আত্মহত্যার খবর তুলনামূলকভাবে কম প্রকাশ পেয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
আঁচল ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, আত্মহত্যাকারী স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীরা তাদের জীবদ্দশায় নানা বিষয়ের সম্মুখীন হন যা তাদের আত্মহননের পথে ঠেলে দিতে বাধ্য করে। আত্মহত্যার পেছনে জরিপে উঠে আসা তথ্যে দেখা যায় মান-অভিমান তাদের সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ করে তোলে। ২৭.৩৬ শতাংশ স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন অভিমানে। তাদের বড় অংশেরই অভিমান পরিবারের সঙ্গে। অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রেমঘটিত কারণ যা ২৩.৩২ শতাংশ, পারিবারিক কলহ ৩.১৪ শতাংশ, হতাশাগ্রস্ততা ২.০১ শতাংশ, মানসিক সমস্যা ১.৭৯ শতাংশ, আর্থিক সমস্যা ১.৭৯ শতাংশ, উত্ত্যক্ত, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথে ধাবিত হয়েছেন ৩.১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী।
বয়সভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৩-১৯ বছরে বয়ঃসন্ধিকালীন শুরু থেকে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের মোট আত্মহত্যাকারী মানুষের প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ এই বয়সসীমার মধ্যে। আত্মহত্যার তালিকায় এরপরই রয়েছেন ২০-২৫ বয়সসীমার যুবক-যুবতীরা।
২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যার প্রবণতা সব লিঙ্গের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে, তবে নারীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি। মোট ৩১০ জন আত্মহত্যা করেছেন, এর মধ্যে নারী রয়েছেন প্রায় ৬১ শতাংশ। এদিকে পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হারও কম নয়; প্রায় ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তৃতীয় লিঙ্গের এবং ট্রান্সজেন্ডারদের মধ্যে একজন করে আত্মহত্যা করেছেন, যা মোট সংখ্যার যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।
এর সম্ভাব্য সামাজিক ও মানসিক কারণগুলোর দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। নারী শিক্ষার্থীরা সাধারণত আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ থাক। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সহযোগিতা নারীদের জন্য আরও বেশি প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসএসসি বা সমমান অর্থাৎ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। ২০২৪ সালে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী। এরপরই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান। এ হার ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ। তা ছাড়া স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৪ সালে এ পর্যায়ে আত্মহত্যার হার ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়া প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মহত্যা লক্ষ্য করা গেছে। এ স্তরের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। তথ্যানুযায়ী, মোট আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ২৯ শতাংশ। ঢাকা বিভাগের পরই আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। যথাক্রমে বিভাগ দুটিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার হার ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে আত্মহত্যার হার সমান, উভয় বিভাগে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ করে। অন্যদিকে, রংপুরে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সিলেটে ২ দশমিক ৯ শতাংশ আত্মহত্যা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আঁচল ফাউন্ডেশন স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে কাউন্সেলিং সেবা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য ‘স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বাসেডর’নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত কর্মশালা পরিচালনা করার কথা বলছে সংস্থাটি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে ধারণা কম। বিষয়টি নিয়ে তারা সচেতনও না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ পর্যায়ে কিছু শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক সায়্যেদুল ইসলাম বলেন, সফলতা উদযাপন করা হলেও ব্যর্থতাকে সামাল দেওয়ার বিষয়টি সমাজে শেখানো হয় না। তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তানসেন রোজ ও আইনজীবী নওফেল জামির।
আগামী নির্বাচনে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন না দিতে সতর্ক থাকবে বিএনপি
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরাতে রিভিউ শুনানি কাল
চোরদের দিয়ে আর নির্বাচন করবেন না: ড. সাখাওয়াত
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে: তারেক রহমান
সীমান্তে জিরো পয়েন্ট এড়িয়ে চলার আহ্বান বিজিবির