নির্বাচনের নামে ব্যবসায়ীরা সব করায়ত্ত করেছে

সিপিডির নির্বাহী চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, সমাজ আজ অতিমাত্রায় অন্যায্য হয়ে পড়েছে। সর্বত্র সুবিচারের সংকট, আর্থসামাজিক বৈষম্য। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিংবা প্রশাসন কোনো বিভাগই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের নামে ব্যবসায়ী সমাজ নির্বাচনী কার্যক্রম করায়ত্ত করেছে, সবকিছু তারা করায়ত্তে নিয়েছে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত জাপানের এশিয়ান গ্রোথ ইনস্টিটিউটের (এআইজি) ভিজিটিং প্রফেসর নজরুল ইসলামের ‘আগামীর বাংলাদেশের জন্য ১০ করণীয়’ শীর্ষক আব্দুল গফুর স্মৃতি বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থার নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. রওনক জাহান, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, সমাজ আজ অতিমাত্রায় অন্যায্য হয়ে পড়েছে। সর্বত্র সুবিচারের সংকট, আর্থসামাজিক বৈষম্য। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিংবা প্রশাসন কোনো বিভাগই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের নামে ব্যবসায়ী সমাজ নির্বাচনী কার্যক্রম করায়ত্ত করেছে। দলীয় মনোনয়নকে ভাগ্যবদলের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন তারা। এখানে বিনিয়োগ করেন তারা। এরপর নির্বাচিত হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব খাটায়। অথচ কে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে, সেটা একটা বড় বিষয় ছিল। মূলত, রাজনৈতিক অর্থনীতির পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের সুশাসনের ঘাটতির উদাহরণ হিসেবে ড. রেহমান সোবহান বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাছাই পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। কার ফাইল তলব করা হবে, কার ফাইল এড়িয়ে যাওয়া হবে সে ক্ষেত্রে এখনো সর্বজনীন হতে পারেনি। পুলিশ প্রশাসনও যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। অন্যায়ভাবে কারও ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেওয়া হয়। আবার কারও ক্ষেত্রে এই সুযোগ নেই।

অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘আমাদের সামাজিক সংহতিতে রাজনৈতিক বিভাজন বড় সমস্যা। দলীয় বিভাজনের কারণে এক সরকারের নেওয়া ভালো উদ্যোগ অন্য সরকার বাতিল করে দিচ্ছে। রাজনীতিকরা কি আসলে সুশাসন চান?’

তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দলীয় প্রধানের কাছে সব ক্ষমতা। নির্বাচনে তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে মনোনয়ন দিতে পারেন। হোক সে ভালো লোক কিংবা চাটুকার। সরকার দলীয় প্রধানের হাতে রয়ে গেছে। এখানে ভারসাম্য নেই।

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণির রাজনৈতিক এবং সামাজিক রূপান্তরের বিষয়টি দেখা দরকার। তিনি বলেন, দেশে গত কয়েক বছরে আয়-বৈষম্য বেড়েছে এ কথা ঠিক, তবে পৃথিবীর অনেক দেশেই বাংলাদেশের চেয়ে বৈষম্য আরও বেশি। আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা ভেবে দেখা দরকার। সভাপতির বক্তব্যে ড. বিনায়ক সেন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সফল হওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশের প্রধান সাফল্য হচ্ছে দারিদ্র্যবিমোচন।

বক্তৃতায় অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে শত্রুতা নয় স্লোগানের বাস্তবতা কী। এবার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দেশের টানাটানির ঘটনা দেখা গেছে। বৈদেশিক নীতির স্বচ্ছতা থাকা দরকার। কোন দেশকে আমরা কী সুবিধা দিচ্ছি, সেটার স্বচ্ছতা থাকা দরকার। এসবের জন্য জনগণকে আস্থায় নিতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের সুফল আশা করা যায় না। মোট কথা, আমাদের প্রকৃতই একটি বৈদেশিক নীতি প্রয়োজন। যেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি থাকবে।’

বক্তৃতায় বাংলাদেশের আগামীর করণীয় হিসেবে ১০ প্রস্তাব করেন তিনি। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, সুশাসন অর্জন, গণতন্ত্রের মানোন্নয়ন ও আনুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থার প্রবর্তন, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, গ্রাম পরিষদ গঠন। এ ছাড়া ভৌগোলিক বৈষম্যের অবসান, সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি, নারী, শিশু, তরুণ ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ, সর্বজনীন সামরিক শিক্ষা প্রবর্তন, ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালীকরণ ও নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করা।

এই ১০ প্রস্তাবের প্রতিটির বাস্তবতা এবং কেন প্রবর্তন করতে হবে তার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে এখনো গণতন্ত্র স্থিতিশীল হতে পারেনি। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং রাষ্ট্রক্ষমতা প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিচ্ছে। এতে অবৈধ এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এসব কারণে গণতন্ত্র গুণগত মানের উন্নয়ন হয়নি। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসেনি। এ ক্ষেত্রে সংস্কার হিসেবে সংখ্যাঘরিষ্ঠতাভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থা ত্যাগ করে আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে অর্থনৈতিক অসমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে আয় বিতরণ অত্যন্ত বৈষম্যপূর্ণ পর্যায়ের। অর্থনৈতিক এই বৈষম্য রাজনৈতিক বৈষম্য ডেকে আনে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর উচ্চবৃত্ত শ্রেণির প্রভুত্ব কায়েম হয়। এ কারণে সরকারের বিভিন্ন নীতি সিদ্ধান্ত বিত্তবান শ্রেণির স্বার্থে ব্যবহার হয়। এসবের ফলে সাধারণ মানুষ এবং রাষ্ট্রের কল্যাণকামিতা কমতে থাকে। এই বাস্তবতায় বৈষম্য হ্রাস শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং অত্যন্ত জরুরি। বৈষম্য কমানো সম্ভব না হলে দেশের রাজনৈতিক এবং নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে বিত্তশালীদের প্রভাব বাড়তেই থাকে। বৈষম্য কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিকে তিনি বৈষম্য ফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া অসম আয় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিদেশি বিলাসী পণ্যের চাহিদা তৈরি করেছে। এতে আমদানিতে চাপ বেড়েছে। এ ছাড়া বৈষম্যের কারণে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করে। বিনিয়োগের পরিবেশের ক্ষতি করে।

সুশাসন প্রসঙ্গে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, সুশাসনের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যায়, সুশাসনের ঘাটতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতের অনিয়ম, পুঁজিবাজার সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনা মানের অবনমন হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, গবেষক, উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিদরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।