পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে বিদায়ী ভাষণে জেনারেল কামার জাবেদ বাজওয়া স্বীকার করেন, সামরিক বাহিনী দশকের পর দশক ধরে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। এ সময় তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন, ভবিষ্যতে পাক সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকবে।
কিন্তু জেনারেল বাজওয়ার ওই ভাষণের ১৪ মাস পর পাকিস্তানে উল্টোচিত্র দেখা যাচ্ছে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দেশটির জাতীয় নির্বাচন। সেই পুরনো ‘এস্টাবলিশমেন্ট-প্রভাব’ আবারও আলোচনায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পরপর দুই দিনে ১০ ও ১৪ বছর কারাদ-াদেশ পান আলাদা দুটি মামলায়। রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হয়েছেন ১০ বছরের জন্য। তার দল প্রতীক ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। হামলা-মামলার মুখে নেতাকর্মীদের। প্রশাসন-বিচার বিভাগ মিলে ইমরান ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর ওপর যা যা করছে তা যে সেনাবাহিনী তথা এস্টাবলিশমেন্টের প্রভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই।
পাকিস্তানের সাংবাদিকরা ইমরান খান ও পিটিআই নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে চাপের মুখে পড়ছেন। নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন পাকিস্তান মুসলিম লগি-নওয়াজের (পিএমএলএন) নেতা নওয়াজ শরিফ। কয়েক মাস আগেও যিনি ছিলেন আজীবন নিষিদ্ধ নির্বাসিত রাজনীতিক। এখন অবশ্য তার সামনে কোনো বাধাই আর নেই। তার সামনে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভুট্টো পরিবারের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। তবে বিষয়টি নিশ্চিতই যে, পিপিপি ততটা লড়াই গড়ে তুলতে পারবে না।
লাহোর-ভিত্তিক সাংবাদিক ও সম্পাদক বদর আলম বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী মনে করে, তারা দেশের অস্তিত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং তারা রাষ্ট্রের অ-সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ প্রভাব বজায় রাখে।
পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী সরাসরি তিন দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল। স্বাধীনতার ৭৭ বছরের বাকি সময়েও তাদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরের মেয়াদপূর্ণ করতে পারেনি। তবে চার সামরিক শাসকের তিনজন নয় বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন।
পিএমএলএনের সাবেক নেতা ও দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেন, ‘১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী প্রথম ক্ষমতা নেয় এবং সামরিক আইন জারি করে। এরপর তারা এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেছে যা দেশে এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’
চির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হয় ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে। এসব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দেশে নিজেদের কেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠা করেছে। এ নিয়ে বদর আলম বলেন, ভারতের থেকে আসা ‘সত্যিকার’ কিংবা ‘কাল্পনিক’ হুমকির কথা বলে সামরিক বাহিনী প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র থেকে ব্যাপক তহবিল পায় এবং এতে নিজের অস্তিত্ব শক্তিশালী করে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে এখনো কেন রাজনীতিকরা শক্তিশালী নয় এবং এই ব্যবস্থার মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা কীভাবে হচ্ছে এসব নিয়ে কথা বলেছেন লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আসমা ফাইজ। তিনি এই ব্যবস্থাকে ‘এস্টাবলিশমেন্টোরিয়ান ডেমোক্রেসি’ আখ্যা দিয়ে এর জন্য দেশের প্রতিষ্ঠাকালে রাজনীতিকদের ভূমিকাকে দায়ী করেন তিনি। পরে দেশের রাজনীতিতে এই ব্যবস্থা টিকে থাকার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পাকিস্তান হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ যেখানে রাজনীতিকরা বিভক্ত।
তবে এর জন্য পাকিস্তানের রাজনীতিকদের সুবিধাবাদী নীতিও যে দায়ী তা অস্বীকার করেন না রাজনীতিকরাই। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের একজন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, রাজনীতিবিদরা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে নিতে আগ্রহী থাকে। শুরু থেকে তারা এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত।