নেত্রকোণায় অবৈধ ইটভাটার দাপট, প্রশাসন নীরব  

নেত্রকোণা জেলায় অবাধে চলছে অবৈধ ইটভাটা। উচ্চ আদালত এসব ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দিলেও জেলা থেকে নেওয়া হচ্ছে না ব্যবস্থা। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে ভাটার মালিকরা। জেলায় ৫৪টি ইটভাটা থাকলেও এ বছর চালু রয়েছে ৪০টি। সচল ভাটার মধ্যে নিবন্ধন আছে মাত্র ৪টির। ৩১টির বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নেত্রকোণার আদালতে মামলা করেছে। একটির বিরুদ্ধে আদালত বন্ধ করে দেওয়া আদেশ দিয়েছেন। ৫টি ইটভাটা অবৈধভাবে চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর জানুয়ারি মাসে ২২ তারিখে মামলার আদেশ মূলে কেন্দুয়ায় মেসার্স ঢাকা ব্রিকস নামে একটি ভাটা সামান্য অংশ ভেঙ্গে বন্ধ বন্ধ করে দিলেও পরদিন ফের ভাটা চালু করে মালিক পক্ষ।

পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে গতবছর ১০ নভেম্বর উচ্চ আদালতে রিটও হয়েছে এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ নভেম্বর বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ দেশের সব অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধে দেশের জেলা প্রশাসকদের সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেন। এ বিষয়ে নির্দেশনা দিতে মন্ত্রীপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পরিবেশ সচিবকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এই নির্দেশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চললেও নেত্রকোণা জেলার চিত্র ভিন্ন। এখানে প্রশাসন অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। 

এদিকে ইটভাটার মাটি পরিবহনে প্রতিনিয়ত ট্রাক্টর চলাচল করায় গ্রামীণ রাস্তার ক্ষতি হচ্ছে। ইটভাটার ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ফসলি জমি তার উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। ছাড়পত্র না থাকা ইটভাটা গুলোর উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে হালনাগাদ তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নেত্রকোণা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আবু সাঈদ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৪ ধারায় বলা আছে, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত, সেই জেলার জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইটভাটা স্থাপন ও ইট প্রস্তুত করতে পারবে না। ওই আইনের ৮(১) ধারায় বলা আছে, ছাড়পত্র থাকুক বা না থাকুক, আইন কার্যকরের পর আবাসিক বাণিজ্যিক ও সংরক্ষিত এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ভাটা স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু এর নিয়ম মানা হয়নি ইটভাটা গুলোতে। এইসব ইটভাটা থেকে বসতি, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব খুবই কম। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নেত্রকোণা সদর উপজেলা সহ ৯টি উপজেলার ভাটার পাশেই ফসলি জমি, বিদ্যালয়, রেললাইন ও লোকালয় রয়েছে। জেলার আটপাড়া মাটিকাটা গ্রামের কাঞ্চন ও স্কুল শিক্ষার্থী প্রিয় সহ অনেকেই বলেন, নেহল ব্রিকস নামে ইটভাটার ধুলাবালিতে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। 

কেন্দুয়ার ভগবতীপুর গ্রামের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাস্তা ও বসতবাড়ির আশপাশে ইটভাটার ধুলাবালি ওড়ে। এতে শিশু ও বয়স্কদের সমস্যা হয়। ফলের গাছের ফলনও কমছে। ইটভাটাটি প্রশাসন বন্ধ করলেও পরদিন মালিক পক্ষ আবার চালু করে দেয়। প্রশাসনকে জানিয়ে লাভ হয় না। ভাটার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চায় না।

মেসার্স ঢাকা ব্রিকস এর পরিচালক মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরে ও ডিসি অফিসে প্রতি বছর সরকারী ফি দিচ্ছি। এটা আমি একা না সারা বাংলাদেশের ভাটার মালিকরা দিচ্ছে, এটি আবার ঘুষ না। ভাটা বন্ধ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে উল্টো প্রশ্ন করেন, ভাটা বন্ধ করে দেন। শত শত লোক কর্ম হারাবে আপনারা তাদের সংস্থান করে দিতে পারবেন? তবে ইটভাটা গুলোর মালিকেরা নিয়মিত সরকারকে আয়কর ও ভ্যাট দিচ্ছেন।

পরিবেশবাদী সংগঠন শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলপনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইটভাটার নির্মাণের সময় যদি প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করত তাহলে যত্রতত্র অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠত না। পরিবেশ রক্ষার জন্য একটি অধিদপ্তর রয়েছে তারা কেন খোঁজ নিয়ে বা খবর পেলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করে না? প্রশাসন মাঝে মধ্যে হুটহাট মনিটরিং করে। অবৈধ ইটভাটা ও পরিবেশ নিয়ে মানববন্ধন হলে তখন প্রশাসন অভিযানে যায়।

নেত্রকোণা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবু সাঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বছর চালু থাকা ৪০টি ভাটার মধ্যে ৪টির পরিবেশের ছাড়পত্র রয়েছে। ৩১টির বিরুদ্ধে বিশেষ আইনে নেত্রকোণার আদালতে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করেছে। জেলার কেন্দুয়ার মেসার্স ঢাকা ব্রিকস নামে একটি ভাটা ধ্বংস করে দেওয়া রায় দিয়েছে আদালত যা আমরা কার্যকর করেছি। আর পাঁচটি ইটভাটার আবেদন বাতিল করেছি এগুলো এভাবেই চলছে। আমরা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করবো। 

নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক মো. শাহেদ পারভেজ এর কাছে এসব অবৈধ ইটভাটার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েকদিন আগে কেন্দুয়ায় অভিযান চালিয়ে একটি ভাটা বন্ধ করা হয়েছে। অবৈধ ইটভাটায় অভিযান অব্যাহত থাকবে।