ভারতে রাতের আঁধারে ভাঙা হল ৮০০ বছরের প্রাচীন মসজিদ

ভারতের দিল্লির মেহরাউলিতে অবস্থিত প্রায় ৮০০ বছরের প্রাচীন একটি মসজিদ রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত এ মসজিদটির নাম ‘আখুনজি মসজিদ’।

গত ৩০ জানুয়ারি বুলডোজারের মাধ্যমে পুরনো আখুনজি মসজিদটি ভেঙে ফেলে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ডিডিএ)। খবর দ্যা ন্যাশনাল এবং দ্যা প্রিন্ট।  

দ্যা প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) ভোরে বুলডোজারের শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠেন আখুনজি মসজিদের ইমাম জাকির হুসেন। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই মসজিদে ইমামতি করছেন তিনি।

বুলডোজার দিয়ে মসজিদ ভেঙে ফেলার দৃশ্য

জাকির হুসেন জানান, ‘মোট ১০টি বুলডোজার দিয়ে মসজিদটি ভাঙা হয়েছিল। কয়েক ঘন্টার মধ্যে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মসজিদের পুরো চত্বরটি ধ্বংস করে দেয়। মসজিদের পাশাপাশি বাহরুল উলূম মাদ্রাসা যেখানে ২৫ জন এতিম শিশু থাকতে সেটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।'

মসজিদ ভাঙার সাথে সাথে চত্বরের একটি কবরস্থানও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইমাম জাকির হুসেন।

তিনি আরও বলেন, মসজিদ ও মাদ্রাসা ধ্বংস করার আগে এতিম শিশুগুলোকে কাছের একটি জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধ্বংস প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তীব্র শীতের মধ্যে সেখানেই বসিয়ে রাখা হয়।

দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের আগাম নোটিশ ছাড়াই প্রাচীন এই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে দাবি জানান ইমাম জাকির হুসেন। তিনি ফোনে অন্যদের মসজিদ ভাঙার কথা জানাতে চাইলে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন হুসেন।

মেহরাউলির মসজিদ আখুনজির দিকে যাওয়া রাস্তাগুলি ব্যারিকেড করা

এদিকে মসজিদটি গুড়িয়ে দেওয়ার পর এলাকাটিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোনো সময় সহিংস দাঙ্গা শুরু হয়ে যেতে পারে পরে শঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে এক বিবৃতিতে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলেছে, আখুনজি মসজিদটি একটি অবৈধ স্থাপনা। এটি সঞ্জয় বনের সংরক্ষিত এলাকায় দাঁড়িয়ে ছিল। মসজিদটি যেখানে ছিল সেটি দিল্লি রিজের দক্ষিণাংশের আরাবল্লি চিতাবাঘ বন্যপ্রাণী করিডোরের অংশ। ১৯৯৫ সালের রিজ সুরক্ষা আইন অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

তবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন মসজিদ পরিচালনা কমিটি।

দিল্লির ইতিহাসবিদ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ সোহেল হাশমি বলেন, ‘কুতুব মিনার থেকে ৪০০ মিটার দূরের এই মসজিদটি দিল্লির ৩ হাজার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় থাকা একটি মসজিদ। ১৯২০ সালে ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানেও এ মসজিদের নাম রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সংরক্ষিত বন ঘোষণার বহু আগে থেকে মসজিদটি এখানে রয়েছে। এটি অবৈধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া ডিডিএ এর আগে বেশ কয়েকবার বলেছে, তারা কোনো ধর্মীয় স্থাপনায় হাত দেবে না। তারপরও তারা কী কারণে মসজিদটি ভেঙে ফেলল তা বোধগম্য নয়।’

তক্ষ্যদর্শী বাসিন্দারা শোয়েব খান বলেন, কবরগুলো খুঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং কবরের পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাত্র ১৩ দিন আগে এক নবজাতককে এই চত্ত্বরে কবর দেওয়া হয়। সেই কবরও খুঁড়ে কাফন বের করে ফেলেছে তারা। সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য!

জাকির হুসেন বলেন, দিল্লি হাইকোর্ট শুধু সীমানা নির্ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছিল। কোনো কিছু ধ্বংস করতে বলেনি। কিন্তু তারা কবরগুলো পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দিলো।

দ্যা প্রিন্ট বলছে, অননুমোদিত জানিয়ে যে কোন সময় ভেঙে ফেলার ঝুঁকিতে রয়েছে নয়াদিল্লির অন্তত আরও চারটি মসজিদ, যার মধ্যে লুটিয়েন্স এলাকার ১৫০ বছরের পুরনো সুনেহরি মসজিদ ও রয়েছে।