জমি বাড়ি গাড়ি কিনতে পারবেন না খেলাপিরা

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বড় ধরনের সংকটের মুখে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ইচ্ছা-খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব ঋণখেলাপিরা বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তারা নতুন করে জমি-বাড়ি-গাড়ি কিনতে পারবেন না। নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না তারা।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। সভা শেষে এসব তথ্য জানান ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ মো. নাসের। ওই সভা শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি কমাতে ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ধরতে ১১ দফা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ছয় দফাও ঘোষণা করা হয়েছে।

আবু ফারাহ মো. নাসের বলেন, এর আগেও আমরা খেলাপি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিন্তু খেলাপি সেই অর্থে কমেনি। তবে এ রোডম্যাপের মাধ্যমে খেলাপি কমে আসবে। নতুন পথনকশায় (রোডম্যাপ) ব্যাংক খাতের খেলাপিদের আর ছাড় না দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাছাড়া খেলাপি ঋণ অবলোপন ও অবলোপন ঋণ আদায়ে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমার বেশি ঋণ না দেওয়া, যোগ্য স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ এবং শেয়ারধারী পরিচালকদের যোগ্যতা নির্ধারণ করার বিষয়েও পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

ডেপুটি গভর্নর বলেন, খেলাপিদের ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বিশেষ করে আগে খেলাপিদের চিহ্নিত করা হলেও ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করা হতো না। এখন থেকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ইচ্ছা-খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এসব ঋণখেলাপি বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তারা নতুন করে জমি-বাড়ি-গাড়ি কিনতে পারবেন না। নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না তারা।

আবু ফারাহ নাসের বলেন, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৮ শতাংশের নিচে নামানো হবে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে। আর ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সীমাতিরিক্ত, বেনামি স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং জালিয়াতি অথবা প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ বিতরণের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনা হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পরিপালনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রোডম্যাপে খেলাপি নির্ধারিত সময়সীমায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কারা দুর্বল ব্যাংক তাদের ক্রাইটারিয়া বর্ণনা করে দিয়েছে। যদি কোনো ব্যাংক ওই ক্রাইটারিয়ার মধ্যে পড়ে তাহলে ব্যাংকের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের বার্ষিক প্রতিবেদন ধরে ২৫ সালের মার্চে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের আমানত গ্রহণ, ঋণ বিতরণসহ অনেক কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। ফারাহ নাসের বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই ব্যাংকগুলোকে এসব বিষয় জানিয়ে দিয়েছি। যাতে তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থান উন্নতি করতে পারে। যদি কেউ উন্নতি করতে না পারে তাহলে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা চাই না কোনো ব্যাংক খারাপ করুক বা দুর্বল হয়ে পড়ুক।

হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেক খেলাপি ব্যাংকের পরিচালক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর্টের আদেশের বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। এটা সংবিধানে নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, উন্নত দেশগুলোতে অর্থঋণের বিষয়ে হাইকোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানায় না। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রচলন থাকার কারণে খেলাপিরা সুযোগ নিচ্ছে। তাই খেলাপি কমাতে কোর্ট, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, না হয় খেলাপিদের দৌরাত্ম্য কমানো যাবে না।

নতুন রোডম্যাপ কতটা কার্যকর হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইএমএফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে ও ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে নতুন এ রোডম্যাপের প্রয়োজন ছিল। এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা কার্যকর করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) দেখানোর জন্য। শর্ত পূরণ করতে না পারলেও তারা ব্যাংকগুলোকে কিছু বলে না। তবে খেলাপিদের ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোপম্যাপ দিয়েছে, এটা ভালো। অতীতে এরকম যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো ছিল কাগুজে। এটাও কাগুজে হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নে তারা সঠিক উদ্যোগ নিচ্ছে কি না তার ওপর।

খেলাপি কমাতে ১১ কর্মপরিকল্পনা : ২০২৬ সালের মধ্যে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশে নিচে নামিয়ে আনতে মন্দঋণ অবলোপনের সময় তিন থেকে কমিয়ে দুই বছর করা হবে। এ ক্ষেত্রে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হবে। শতভাগ প্রভিশন রাখলে ব্যাংকে ঝুঁকি থাকবে না বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ পদক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৩০ কোটি বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ হ্রাস পাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন দেশে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা, এখন তা বেড়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা হয়েছে, যা বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ইউনিট’ নামে একটি পৃথক ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে রোডম্যাপে। এ ঋণ আদায়ের লক্ষ্য অর্জন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পারদর্শিতায় যুক্ত করা হবে।

বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয় পরিকল্পনায়। এতে মন্দঋণ এবং অবলোপনকৃত সম্পদ সেই কোম্পানির কাছে বিক্রয় করে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক স্থিতিপত্র পরিষ্কার করতে পারবে এবং প্রাপ্ত অর্থ ব্যাংকের আয় হিসেবে যুক্ত হবে।

পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের জন্য দেওয়া বাড়তি মেয়াদ আর বৃদ্ধি করা হবে না বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি মনে করে, এতে ব্যাংকের তারল্য সংকট কমবে। ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে পথনকশায়। এজন্য খেলাপি ঋণ আদায় করা কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ভাতা চালুর কথাও বলা হয়। ঋণের জামানত বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে দিয়ে মূল্যায়ন করাতে হবে।

খেলাপি ঋণ কমাতে অন্যতম কঠোর পদক্ষেপ হলো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে প্রকৃত আদায় ছাড়া সুদ অথবা মুনাফা আয় খাতে নেওয়া যাবে না। প্রকৃত আদায় না হওয়া পর্যন্ত আলাদা ব্যালান্স শিটে রাখতে হবে। এর ফলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হতে দেবে না।

অন্যদিকে মেয়াদি ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সময় আন্তর্জাতিক চর্চায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সব ধরনের মেয়াদি ঋণ ওভারডিউ হওয়ার পর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে শ্রেণীকরণ করতে হবে, যা বর্তমানে ৯ মাসে করা হয়। এতে খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়ে যাবে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দেশের ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান লিগ্যাল টিম অথবা আইন বিভাগকে শক্তিশালী করার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থ ঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালার ফলে ঋণগ্রহীতাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করার প্রবণতা হ্রাস পাবে।

সুশাসন ফেরাতে ছয় পরিকল্পনা : ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে ব্যাংকের শেয়ারধারী পরিচালকদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা সংশোধন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয় পথনকশায়। তাতে ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হবে বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, তাদের সম্মানী নির্ধারণ এবং দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এতে স্বতন্ত্র পরিচালকরা আমানতকারী ও শেয়ারধারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে। এখন দুই-তিনটি ব্যাংক ছাড়া সব ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালকরা শেয়ারধারী পরিচালকদের অনুগত। ফলে তারা পরিচালনা পর্ষদের স্বার্থই বেশি দেখছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগে বাছাই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পারদর্শিতার সূচকের ভিত্তিতে এমডিদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে। এখন একাধিক ব্যাংকের এমডিদের শিক্ষাগত সনদ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে অনেকের অনিয়ম ধরা পড়লেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা এখন একজন গ্রাহক যে ঋণ নিতে পারে, তার বেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হবে। এতে একীভূত হওয়ার তিন বছর পর্যন্ত কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। এর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ শক্তিশালী হবে, মূলধন ঘাটতি দূর হবে ও খরচ কমে আসবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে মৌলিক প্রশিক্ষণ ও ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বাধ্যতামূলক করা হবে।