নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ১৬ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড ও ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাদের অর্থদন্ডও করা হয়। মৃত্যুদন্ড ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত সব আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে প্রত্যেকের দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেয় আদালত। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) ফাতেমা ফেরদৌস এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে কাঠগড়ায় ১৫ আসামি উপস্থিত ছিলেন। বাকি এক আসামি পলাতক।
মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. রুহুল আমিন, মো. হাসান আলী বুলু, মো. সোহেল, স্বপন, ইব্রাহীম খলিল, আবুল হোসেন আবু, মো. সালাউদ্দিন, মো. জসীম উদ্দিন, মো. মুরাদ ও মো. জামাল।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন মো. হানিফ, মো. চৌধুরী, মো. বাদশা আলম প্রকাশ কুড়াইলা বাসু, মোশারফ, মো. মিন্টু প্রকাশ হেলাল (পলাতক) ও মো. সোহেল।
এ রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বেলা ১১টায় আদালতের এজলাসে ওঠেন বিচারক। প্রায় পৌনে ২ ঘণ্টা তিনি রায় পাঠ করেন। এ সময় আদালত প্রাঙ্গন জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। রায় ঘোষণার পরপরই কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামিরা কান্না শুরু করেন। এ সময় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি রুহুল আমিন চিৎকার করে বলেন, ‘আল্লাহরে তুই সাক্ষীরে, আমি কিছু করি নাই। আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে বিচার চাই। আমি নির্দোষ।’ পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা আমাকে গুলি করে মেরে ফেলেন।
মৃত্যুদ- ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের অপেক্ষারত স্বজনরা রায়ের খবর পেয়ে আদালত আঙ্গিনায় কান্নাকাটি ও আহাজারি শুরু করে দেন। এরপর আদালত থেকে বের হয়ে রায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে কোট সড়কে মিছিল করতে থাকেন।
নির্যাতিত ওই নারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুরু থেকেই আদালতের প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল ন্যায়বিচার পাব। আদালতকে বিশ্বাস করেছি। আজকের রায়ে আমি খুশি, সবাই খুশি হয়েছি। বিচার পেয়েছি এখন যেন দ্রুত কার্যকর হয়। তিনি বলেন, আমি আমার পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে থাকতে চাই নিরাপত্তা চাই।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি অ্যাডভোকেট মো. মর্তুজা আলী পাটোয়ারী বলেন, রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট। এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাদী পক্ষের আইনজীবী মোল্লা হাবিবুর রাসুল মামুন বলেন, যুগান্তকারী রায় হয়েছে। অপরাধীদের জন্য এটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আসামি পক্ষের আইনজীবী হারুনুর রশিদ হাওলাদার বলেন, রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে এক নারীকে (৪০) মারধর ও দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতনের শিকার নারী চার সন্তানের জননী। নির্যাতিত নারীর অভিযোগ ছিল, ভোটকেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের পছন্দের প্রতীকে ভোট না দেওয়ার জের ধরে ওই হামলা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি তখন দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। ওই ঘটনার পরদিন (৩১ ডিসেম্বর) নির্যাতনের শিকার নারীর স্বামী সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে চর জব্বর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। পরে মামলার তদন্ত শেষে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কার হওয়া প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিন মেম্বারসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। আলোচিত মামলার রায়টি গত ১৬ জানুয়ারি ঘোষণার তারিখ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ রায় অসম্পূর্ণ থাকায় পিছিয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করে আদালত।