অনুমতি ছাড়া বিদেশিরা কাজ করতে পারবেন না

বাংলাদেশের ভিসা নীতিমালায় কাজ করার অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) গ্রহণের শর্ত না থাকার সুযোগে অনেক বিদেশি অবৈধভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এতে করে একদিকে যেমন স্থানীয়রা কাজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও বিপুল পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে। তবে বিদেশিদের এ সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশে অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিক কাজ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কনফারেন্স হলে কর্মানুমতি ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, আয়কর ফাঁকি দিয়ে অনেক বিদেশি নাগরিক এ-থ্রি ভিসা, বি-ভিসা কিংবা ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা এক প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজে এসে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছেন। ২০০৬ সালে প্রণীত ভিসা নীতিমালায় কর্মানুমতি গ্রহণের শর্ত না থাকায় অনেকে আবার কর্মানুমতি না নিয়ে কিংবা ভিসার মেয়াদ না থাকায় বা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বছরের পর বছর কাজ করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করে দেশ ত্যাগ করেন। এ ক্ষেত্রে আমরা দৈনিক ও প্রগ্রেসিভ হারে জরিমানার বিধান আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই সঙ্গে কর্মানুমতি থাকা সাপেক্ষে বিদেশি নাগরিকরা যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে চান তাহলে নির্ধারিত ফি প্রদান করে সেই প্রতিষ্ঠানে যেতে পারবেন, সে ক্ষেত্রে তার নিজ দেশে গিয়ে পুনরায় ভিসা করার দরকার পড়বে না।

তিনি আরও বলেন, অনেকে ট্যুরিস্ট বা বিজনেস ভিসায় এসে কর্মানুমতি প্রাপ্তির কাগজপত্র প্রসেসিংয়ের জন্য তিন মাস এবং অনুমোদনের জন্য তিন মাস সময় পেয়ে থাকেন। আমরা আজকের সভায় সেটিকে উভয় ক্ষেত্রে এক মাসের মধ্যে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। কর্মানুমতিসহ ভিসা জটিলতা দূর করার জন্য, বিদেশি নাগরিকরা বিভিন্ন দেশ থেকে ভিসার আবেদন করতে পারবেন। বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূতরা অনলাইনের মাধ্যমে সে ভিসার আবেদন আমাদের স্পেশাল ব্রাঞ্চে প্রেরণ করবেন এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ সাত দিনের মধ্য ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করবেন।

ওয়ার্ক পারমিট না নিয়ে কাজ করায় সরকার একদিকে যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী কোনো বিদেশি বাংলাদেশে কাজ করলে আয়কর প্রদান ও কর্মানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ হিসেবে কর্মানুমতি ছাড়া কাজ করা অপরাধ। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেন, আমরা দেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবেদন রাখতে চাই যে, যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল বাংলাদেশেই রয়েছে এবং তাদের রিপ্লেসমেন্টে যেন বিদেশি কর্মীদের না আনা হয়।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আরও বলেন, ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেক বিদেশি নাগরিক অবাধে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছেন। এটি দূর করতে এবং তাৎক্ষণিক তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুরক্ষা সেবা বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিডা, বেপজা, বেজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এনজিওবিষয়ক ব্যুরো, এনএসআই, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রবেশ যোগ্যতাসম্পন্ন একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ইন্টারঅপারেবল ডেটা সেন্টার তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে এক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অন্য প্রতিষ্ঠান সহজেই অ্যাকসেস করতে পারে। এর ফলে বিদেশি নাগরিকদের যাবতীয় তথ্য সহজেই পাওয়া সম্ভব হবে, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের যাবতীয় তথ্য রেগুলারাইজড হবে, সেই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং অপরাধমূলক কর্মকা-ের ওপর সহজেই নরজদারি করা যাবে।

বাংলাদেশে চার-পাঁচ লাখ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে অনুমাননির্ভর তথ্য পাওয়া গেলেও অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা সংখ্যা আমাদের হাতে নেই বলে জানান তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ এবং সুরক্ষা সেবা বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত ভিসায় রয়েছেন ১০ হাজার ৪৮৫, এমপ্লয়ি ভিসায় ১৪ হাজার ৩৯৯, স্টাডি ভিসায় ৬ হাজার ৮২৭ এবং ট্যুরিস্ট ভিসায় রয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৫৬ জন। আনুষ্ঠানিকভাবে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন ভারতীয় নাগরিক ৩৭ হাজার ৪৬৪ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে চীনের নাগরিক, ১১ হাজার ৪০৪ জন।

সভায় স্বাগত বক্তব্যে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, কর্মানুমতি ব্যতীত বিদেশি নাগরিকদের দেশে কাজ করার ফলে, তাদের অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে ক্রমান্বয়ে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদেশি নাগরিকদের নিয়ম মেনেই বাংলাদেশে কাজ করতে হবে।

সভায় বিডার নির্বাহী সদস্য মোহসিনা ইয়াসমিন, কর্মানুমতি ব্যতীত বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে অবস্থানের কারণ, অবৈধ অবস্থানের কারণে সৃষ্ট সমস্যা, ডিজিটালাইজেশন সংক্রান্ত সুপারিশ, এ-থ্রি ভিসা, জরিমানা/শাস্তি, কর্মানুমতি নিশ্চিতকরণ, কর্মানুমতি প্রদানকারী দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়, ভিসা অন অ্যারাইভাল, কালো তালিকাভুক্তসংক্রান্ত সুপারিশগুলো তুলে ধরেন।

সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, সুরক্ষা সেবা বিভাগ সচিব মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের সুপারিশ ও মতামত তুলে ধরেন।