জাবিতে গৃহবধূকে ধর্ষণ

পরিকল্পনাকারীসহ গ্রেপ্তার আরও ২ বিক্ষোভ চলছেই

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে র‌্যাব। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এলিট ফোর্সটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গ্রেপ্তার ওই দুজন হলেন ধর্ষণের পরিকল্পনাকারী মামুনুর রশিদ ওরফে মামুন ও অন্যতম সহায়তাকারী মো. মুরাদ।

এদিকে ওই ঘটনায় জড়িতদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল টানা পঞ্চম দিনের মতো মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, গণসংযোগ, মশাল মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্তদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদও।

ধর্ষণের এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ ও সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা করতে গত বুধবার তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে দেশের উচ্চশিক্ষার তদারক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ধর্ষণের ঘটনায় কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং কেন এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে, সেটি খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।

গত শনিবার রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের একটি কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান এবং তার তিন সহযোগীকে শনিবার রাতেই গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। গত বুধবার রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে মামুনকে এবং অন্যতম সহায়তাকারী মো. মুরাদকে (২২) নওগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, পোশাক কারখানায় চাকরি করার সময় মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েন মামুন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মাদকসেবী শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। কারখানার চাকরি ছেড়ে ২০১৭ সাল থেকে পুরোপুরি মাদক ব্যবসায়ী বনে যান। তিনি কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে প্রতি মাসে কয়েক দফায় প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করে তা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু মাদকসেবী শিক্ষার্থীকে সরবরাহ করতেন। এভাবেই মামলার ১ নম্বর আসামি মোস্তাফিজুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। মাঝে মাঝে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে গিয়ে তিনি রাত্রিযাপন করতেন এবং অন্যদের সঙ্গে মাদক সেবন করতেন।

একই এলাকায় থাকার কারণে ভুক্তভোগী তরুণীর স্বামীর সঙ্গে ৩ থেকে ৪ বছর আগে মামুনের পরিচয় হয়। ওই তরুণীর স্বামীকে দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের এলাকায় মাদক সরবরাহ করাতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন মামুন। কিছুদিন আগে মামুনের থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যা হলে ওই তরুণীর স্বামীকে ফোন করে তিনি জানান, কিছুদিন তাদের বাসায় থাকবেন। এরপর তাদের ভাড়া বাসায় প্রায় চার মাস সাবলেট থাকেন মামুন।

র‌্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, মোস্তাফিজুর ঘটনার আগে মামুনের কাছে অনৈতিক কাজের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মামুন ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ভুক্তভোগীর স্বামীকে ফোন দিয়ে জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই হলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তিনি এখন থেকে হলে থাকবেন। মোস্তাফিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ওই তরুণীর স্বামীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখা করতে বলেন মামুন। সে অনুযায়ী সেদিন সন্ধ্যার দিকে মীর মশাররফ হোসেন হলের ৩১৭ নম্বর কক্ষে যান মেয়েটির স্বামী। মামুন সেখানে তাকে মোস্তাফিজ, মুরাদ, সাব্বির, সাগর সিদ্দিক ও হাসানুজ্জামানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর তাকে বলের, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফোন করে মামুনের ব্যবহৃত কাপড়গুলো নিয়ে একটি ব্যাগে ভরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দিয়ে যান।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, স্বামীর কথায় রাত ৯টার দিকে মামুনের ব্যবহৃত পোশাক ব্যাগে ভরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে যান ওই তরুণী। মামুন ও মোস্তাফিজ ওই ব্যাগ মেয়েটির স্বামীর হাতে দিয়ে ৩১৭ নম্বর রুমে রেখে আসতে বলেন। মেয়েটির স্বামী ওই রুমে গেলে মুরাদ তাকে আটকে রাখেন। আর মামুন ও মোস্তাফিজ মেয়েটিকে হলের পাশে নির্জন স্থানে নিয়ে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করেন।

এদিকে গৃহবধূকে ধর্ষণের প্রতিবাদে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারসংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ঢাকা জেলার শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘জাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ (ঢাকা জেলা)। মানববন্ধন শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় উপাচার্য বরাবর তিন দফার দাবিতে স্মারকলিপি দেয় তারা।

পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শহীদ মিনার থেকে একটি মশাল মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় গণসংযোগ করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’।

আন্দোলনকারীদের দাবিগুলোর মধ্যে হলো ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত ও পলায়নে সহযোগিতাকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও মীর মশাররফ হোসেন হল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যক্ষসহ হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা, সব আবাসিক হল থেকে অছাত্রদের বের করা এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা শাখার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ও যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল কার্যকর করা।