পাকিস্তানে ভোটার বিদ্রোহ

পাকিস্তানে ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের সংঘবদ্ধভাবে ভোট দিতে আসা দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে সবচেয়ে বড় চমক। রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের ৭৫ বছরের ইতিহাসে যে প্রবল জন অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে তারই প্রতিফলন দেখা গেল এই নির্বাচনে। সেনাবাহিনী অনেকটা কোলে করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ)-পিএমএলএনকে ক্ষমতায় আনতে উদ্যত হলে প্রতিদ্বন্দ্বী তেহেরিক-ই-ইনসাফ পাকিস্তান-পিটিআইকে বিনাশের সম্ভব সব চেষ্টাই করেছে। পিটিআই নেতা ইমরানকে কারাগারে বন্দী করে বেআইনিভাবে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে; পিটিআই নেতা-কর্মীদের ওপর জেল-জুলুম করে যে আদিম পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে; পিটিআইয়ের নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নিয়ে তাদের শেষ করে দিতে যে নোংরা খেলায় মেতেছে এস্টাবলিশমেন্ট; জনগণ চুপ করে না থেকে ব্যালটে এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছে।

ukyjy

এই ভোটার বিদ্রোহ দেখে মনে হলো, পেশীশক্তি ও কালোটাকার মালিকেরা জনগণকে যেরকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে; তাদের প্রজা বানিয়ে রাখতে যেসব ভীতির রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা করে; তারা আসলে বুঝতেও পারেন না হয়তো তারা মহাপরাক্রমশালী আদম সুরতকে অগ্রাহ্য করে আসলে নিজেদের কবর খুঁড়তে থাকে। পাকিস্তানে নির্বাচনে জনগণের ভোটকেন্দ্র দখল করা ছিল যেন এস্টাবলিশমেন্টের ওপর জনগণের অতর্কিত জনমত-হামলা। সেনাপ্রশাসন কল্পনাও করতে পারেনি যে জনগণ এত শক্তিশালী হতে পারে।

ইতিহাস থেকে ইতিহাসের খলনায়কেরা আসলে কিছুই শেখে না। তাই তো ১৯৭০ সালে জনগণের এইভাবে ভোটকেন্দ্রে এসে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে গণকণ্ঠস্বর উদ্দীপিত করার বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেসময়ের পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের জন্য কবর খুঁড়েছিল। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এই কালে ঘটছে পাকিস্তানে। জনকন্ঠস্বরকে অগ্রাহ্য করে মরণ খেলার নেশায় মেতে আছে সেই একই সেনাবাহিনী প্রায় অর্ধশতক পরেও। পাকিস্তানের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী আদিল নাজাম বলেছেন, ‘আর খুঁড়ো না; নিজেদের কবরটাকে আর গভীর করো না’।

নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ শেষ হলে; ভোট গণনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় এই ট্রেন্ড স্পষ্ট ছিল— পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দুই তৃতীয়াংশ আসন বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রাত ১০টায় বিজয়ী ভাষণ লিখে লাহোরে দলীয় সদর দপ্তরে পৌঁছে নওয়াজ শরিফ এই দুঃসংবাদ পান। ভাষণ লেখা কাগজটা পকেটে পুরে বাসায় ফিরে যান তিনি। এরপর পিএমএলএন শিবিরেও নেমে আসে সুনসান নীরবতা।

মধ্যরাতের অশ্বারোহীরা সচল হয়। ভোটের ফলাফল আসা বন্ধ হয়ে যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকার ভোটের ফলাফল এসে পড়লেও ইসলামাবাদ, লাহোর, করাচির ফলাফল আসা আটকে যায়। রিটার্নিং অফিসারদের কার্যালয়ের সামনে খাকি পোশাকধারীরা অবস্থান নেয়। ভেতরে ঢুকে ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। অনেক রিটার্নিং অফিসার এই চাপ অগ্রাহ্য করে অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন। জনগণের সামনে সেনাবাহিনীর অপচেষ্টার কথা জানিয়ে দেন। সেসব বয়ানের ভিডিও এখন ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর থেকে গত দুবছর ধরে সেনা প্রশাসনের মুখোশ উন্মোচনের ভার্চুয়াল বিপ্লব ঘটে চলেছে যেন। ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর সাধারণ মানুষ লাহোরে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকে যে হামলা চলিয়েছে; রাওয়ালপিন্ডির সেনাদপ্তরে জনগণ ঢুকে যে হামলা চালিয়েছে; তাতে অনেকেই জেল-জুলুমের কষ্ট স্বীকার করেছেন। কিন্তু অদম্য এই প্রতিরোধ কখনোই থেমে থাকেনি।

এস্টাবলিশমেন্ট ইমরান খানকে শিকারে আদালত নিয়ে তার বেডরুমে ঢুকে পড়ল। বিয়ের আইন ভঙ্গ করেছেন বলে সাজানো আদালতে ইমরান ও তার স্ত্রীকে শাস্তির আদেশ শোনাল। এই ‘গান্ধা কইরা দেওয়া’র বেডরুম মেথডের নিম্ন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নারীবাদী ও তরুণ সমাজ জোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ক্ষমতার জন্য মানুষ এতো নিচে নামতে পারে! নতুন প্রজন্মের জন্য এ এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। এইভাবে ধীরে ধীরে এস্টাবলিশমেন্ট যেন স্ট্রিপটিজের নর্তক হয়ে পড়েছে। তাই তো পাকিস্তানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ভোটের ফলাফল বদলে দেওয়ার ঘটনার প্রামাণিক ভিডিও এখন টক অব দ্য টাউন।

4844

অভিযোগ উঠেছে প্রধান প্রধান শহরগুলোতে; বিশেষত সেনাসদরের আশপাশের আসনগুলোতে ফল উল্টে দেওয়া হয়েছে। এমনকি নওয়াজ শরিফ একটি আসনে হেরে গেলে, আরেকটি আসনে তাকে জোর করে জেতানো হয়েছে; মনগড়া ফলাফলে ভোটারের সংখ্যা তালিকার চেয়ে বেশি এসেছে; এরকম অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে হাজির হয়েছেন পিটিআই নেতারা। নির্বাচন কমিশনের সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ ও সুষ্ঠু ফলাফল দেওয়ার পেশাদার ইচ্ছা ছিল বলে মনে হয়। এমনকী সিভিল প্রশাসনের রিটার্নিং অফিসাররাও অনেক জায়গায় সেনাবাহিনীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। জনগণকে ভোট বিদ্রোহ করতে দেখে অনেকেই সেনাবাহিনী কিংবা নওয়াজের ‘সহমত ভাই’ হতে চাননি।

টিভিতে লাইভ নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার সময় ফলাফল আটকে না রাখার অনুরোধ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন সাংবাদিকেরা। নির্বাচন কমিশনকে তারা জবাবদিহিতায় বাধ্য করেছেন। নির্দলীয় ও পেশাদার সাংবাদিকেরা দেশের জরুরি মুহূর্তে কতটা জনবান্ধব হতে পারেন; তার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে দেখা গেল। সে কারণেই সব বাধা ডিঙ্গিয়ে চূড়ান্ত ফলাফলে পিটিআই সমর্থিত প্রার্থীরা বেশ ভালো ফল করেছেন। নইলে ভোট চুরির আরও বড় ঘটনা ঘটতে পারত বলে মনে হয়।

এই নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে কে সরকার গঠন করবে, কে কার সঙ্গে কোয়ালিশন গড়বে এসব হিসাব নিকাশ চলতে থাকলেও এই নির্বাচনী ফলাফলে যে এস্টাবলিশমেন্টের পরাজয় ঘটেছে এটা স্পষ্ট। এই নির্বাচন জনবিদ্রোহের শেষ নয়। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক  আন্দোলন-সংগ্রাম আরও উত্তাল হবে; কারণ সেনাপ্রাধান্য বিনাশ না করা পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকটের নিরসন হবে না; এটা এখন জনপরিসরে সবাই জানে। যে কোনো অন্যায় আধিপত্যের অবসান ঘটে ছোটখাট মানুষের হাতে; তখন ক্ষমতার তখতে বড় সেজে বসে থাকা গণশত্রুদের অত্যন্ত ক্ষুদ্র দেখায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক