জেলেনস্কির ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে! 

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি জালুঝনিকে সরিয়ে নতুন প্রধান হিসেবে ওলেকসান্দার সির্স্ক্রিকে নিয়োগ দিয়েছেন দেশের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইরত ইউক্রেনের সামরিক কৌশল নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে জালুঝনির সঙ্গে জেলেনস্কির বিবাদের খবর দিয়ে যাচ্ছিল গণমাধ্যমগুলো। জেলেনস্কির এই সিদ্ধান্তকে তার নিজের ও যুদ্ধের জন্য বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশ্লেষকরা। 

গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ ভ্যালেরি জালুঝনির সঙ্গে জেলেনস্কি নিজের একটি ছবি পোস্ট করে সেনাপ্রধানের পদচ্যুতির খবর দেন। সামরিক বাহিনীতে অবদান রাখার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনে তিনি এই পরিবর্তন আনছেন বলে জানান। তিনি রাশিয়াকে হটাতে নতুন করে সামরিক কৌশল প্রণয়নের কথা বলেন। নিজের চাকরিচ্যুতির কথা জানিয়ে জালুঝনি বলেন, ‘২০২২ সালের কাজের সঙ্গে ২০২৪ সালের কাজের ধারার পার্থক্য রয়েছে। তাই প্রত্যেককে পরিবর্তন করতে হবে এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের একত্র হয়ে জিততে হবে।’ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সাংবাদিক রব ম্যাকব্রিড দীর্ঘদিন থেকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে যুদ্ধের সংবাদ প্রচারে ভূমিকা পালন করছেন। তিনি মনে করেন, ‘জালুঝনিকে সরিয়ে দেওয়াটা সহজ কোনো বিষয় না। তাকে সামরিক বাহিনীতে নায়ক হিসেবে দেখা হয় এবং ভবিষ্যতে তিনি জেলেনস্কির সম্ভাব্য বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।’  তিনি আরও বলেন, অনেকে ভাবছেন, এটি হয়তো বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বিচ্ছেদ হলো; বাস্তবতা হচ্ছে যে, জালুঝনিকে বরখাস্তই করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ইউরোপের সামরিক সহায়তার রাস্তা ইউক্রেনের জন্য পরিষ্কার হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থার জটিলতা এখনো কাটেনি। ইউক্রেন রুশদের তার মাটি থেকে হটাতে গোলাবরুদ সংকটে পড়েছে। আবার ইউক্রেনের আবদিভকাও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের মানুষের মনোযোগ কমতে শুরু করেছে। এর মধ্যে জালুঝনির প্রস্থান কিয়েভের শাসকদের জন্য ইতিবাচক নয়।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, জালুঝনির প্রস্থানের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনে সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভক্তি জোরালো করতে পারে এবং পশ্চিমাদের মধ্যেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রেটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর ফেলো অবসরপ্রাপ্ত অস্ট্রেলীয় জেনারেল মিক রায়ান মনে করেন, জালুঝনির মতো জনপ্রিয় ও কৌশলী সামরিক নেতৃত্বের প্রতিস্থাপন করা কঠিন। তিনি বলেন, ‘তার (জালুঝনি) অবসরের মধ্যে দিয়ে ন্যাটো জোট ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের পথ পরিষ্কার করতে পারবেন তিনি। সরকারের মধ্যে অস্থিতিশীলতার ধারণা জেলেনস্কির জন্য সত্যিকারের বিপদ।’ ইউক্রেনীয়দের মধ্যে জালুঝনির জনপ্রিয়তা অনেক। তিনি সাধারণত সামরিক অভিযান নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলতে চান না। তবে যখনই তিনি কথা বলেছেন, তখনই তা জেলেনস্কির জন্য অস্বস্তিদায়ক হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, জালুঝনির জনপ্রিয়তা নিয়ে স্বস্তিতে ছিলেন না জেলেনস্কি। গত বছর একটি সংবাদ সম্মেলনে জালুঝনি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিকে ‘স্থবির’ আখ্যা দেন। কিন্তু প্রকাশ্যে এই দাবিকে উড়িয়ে দেন জেলেনস্কি। কিয়েভ-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকো বলেন, ‘জেলেনস্কি যুদ্ধক্ষেত্রে রাতারাতি কিছু পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন। তিনি নাটকীয়ভাবে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে থাকেন। কিন্তু জালুঝনি সেরকমটা চান না। আবার দুজনের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনও প্রকট। জেলেনস্কি তার সঙ্গে কাজ করতে চান না।’

জালুঝনিকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ জেলেনস্কির বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরও। বিরোধীদলের আইনপ্রণেতা ভলোদিমির অ্যারিয়েভ বলেন, ‘আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন যেকোনো ব্যাখা ছাড়া এই পদচ্যুতির মধ্য দিয়ে গোটা সামরিক বাহিনীর মনোবলকে আঘাত করতে পারে।’