প্রবীণদের জন্য প্রথম ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ চালু হয় ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সের প্যারিসে। তখন তা ছিল চার্চকেন্দ্রিক। এরপর সেই শতকের শেষ সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তা চালু করে। বিশেষ করে, বয়স্ক শারীরিক প্রতিবন্ধী কিংবা যারা আলঝোইমার রোগে আক্রান্ত, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টেক কেয়ার করা হয় সেখানে। বিনা খরচে তাদের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থারও সুযোগ রয়েছে। যেহেতু বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ছে, সেই কারণে অসংখ্য উন্নত দেশে প্রবীণদের জন্য ‘ডে কেয়ার’ স্থাপন করছে। সেখানে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি রয়েছে, বিভিন্ন ধরনের মানসিক সেবাও। কিন্তু আমাদের দেশে রয়েছে, অসংখ্য ‘প্রবীণ নিবাস’। যার সঙ্গে ডে কেয়ারের রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। তবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপারটি উপলব্ধি করে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে ২ বছর আগে শুরু করেছে দেশের প্রথম ‘জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার সেন্টার’। যেখানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জেরিয়াট্রিক কেয়ার বা চিকিৎসা পরিচর্যা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দক্ষ চিকিৎসক এবং সেবিকা রয়েছেন।
বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনাচার এবং দুর্নীতি সংবাদের মাঝে একটি প্রশান্তির সংবাদ জানা গেল। আমাদের দেশেও প্রবীণদের জন্য ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ চালু করবে সরকার। সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, অসহায় বাবা-মাকে আর বৃদ্ধাশ্রমে দিতে হবে না। প্রবীণদের জন্য পাইলট বেসিসে ডে কেয়ার সেন্টার চালু হবে। এ সময় তিনি আরও বলেন, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা ঘরে একা থাকেন। এতে অনেক সময় তারা দুর্ঘটনার শিকার হন। পাশাপাশি বাইরে কর্মজীবী সন্তানদের বাড়তি চিন্তা নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই প্রবীণদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। সেখানে প্রবীণদের জন্য বিনোদন, খেলাধুলা, চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে। দিন শেষে তারা বাড়িতে ফিরে যাবেন। জানা গেল, দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘প্রবীণদের ডে কেয়ার সেন্টার শুরুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
আজ যারা প্রবীণ একসময় তারা ছিলেন নবীন। জনসংখ্যা পরিমিতি অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে উন্নয়নশীল দেশসমূহে প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। অধিকাংশ দেশেই প্রবীণদের সংখ্যা শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও হ্রাস পায়। ফলে শরীরে বাসা বাঁধতে থাকে নানা রোগব্যাধি। পৃথিবীর অনেক দেশ এবং বাংলাদেশেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েরা তার সন্তানকে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে কেয়ার সেন্টারে রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রবীণদের জন্য ‘বৃদ্ধ নিবাস’ ছাড়া তেমন কোনো সুযোগ নেই। তবে বেসরকারি এবং সরকারিভাবে যা আছে তা নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির। আমাদের দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিশুদের ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ রয়েছে। সরকার তাদের সুরক্ষা দিতে এরইমধ্যে আইন করেছে। ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আইন’ নামে সেটি রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিশুর কোনো অব্যবস্থাপনা হলে বা শিশু হারিয়ে গেলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। একই আইন প্রবীণদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টারেও চালু করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয়, ‘বৃদ্ধাশ্রম’ এবং ‘ডে কেয়ার সেন্টারের’ মধ্যে যে পার্থক্য তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এটি কি আবাসিক না অনাবাসিক হবে? যদি অনাবাসিক হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই বৃদ্ধাশ্রম শ্রেণিতে পড়বে না। তবে অনাবাসিক হলেও এটি স্বস্তির সংবাদ।
যে বিষয়টি প্রকট আকারের বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে, তা হচ্ছে আর্থিক বিবেচনায় প্রবীণদের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস। স্বাভাবিকভাবেই ধনী পরিবারের অনেক বয়স্ক মা-বাবা ডে কেয়ারে যাবেন। তারা সেখানে আর্থিক প্রাবল্য দেখাবেন। এর ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত প্রবীণদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হবে। মনস্তাত্ত্বিক এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে সরকারের বিবেচনা করা দরকার। সেখানে যেন কোনো ধরনের শ্রেণি বিভাজন না হয়। আমাদের দেশে শতকরা ৯৯ শতাংশ মানুষ শারীরিক সুস্থতার কথা ভাবেন। কিন্তু মানসিক সুস্থতা কোনোভাবেই শারীরিক সুস্থতার চেয়ে কম নয় সেই বিবেচনাবোধ আমাদের এখনো তৈরি হয়নি। আশা করব, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।