নাটক সিনেমা ওটিটি

এই যুগে সীমানা নিয়ে কেউ ভাবে না

আমাদের বিনোদন মাধ্যমে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে। করোনা পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এই ইতিবাচক পরিবর্তনপর্বটা ঘটেছে এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবার নিজের অবস্থান তুলে ধরার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্রের এই উত্থানপর্বে বলতে গেলে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ অবশ্যই একটা মাইলফলক। আমাদের অর্ধশতক পেরোনো দেশের ইতিহাসে প্রথম এই সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে অফিশিয়ালি নির্বাচিত হয়েছে। আমি মনে করি এটা মাত্র শুরু। কারণ তরুণ প্রজন্মের যারা রয়েছেন, ছেলেমেয়ে যেই হোক না কেন, তারা আর সীমান্তকে বাধা মনে করে না। এই বিষয়টি আমার অনেক ভালো লাগার একটা জায়গা।

অনেকের সঙ্গেই আমার কথা হচ্ছে, চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলছি এবং আমি যাদের সঙ্গে কাজ করছি তারা বেশিরভাগই তরুণ নির্মাতা। তাদের মধ্যে ওই লক্ষ্যটা রয়েছে যে, সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে। আর এখন যেহেতু বিশ্বায়নের যুগ, তাই বর্ডারকে বাধা মনে করাটাই এক ধরনের বোকামি। আমরা ইদানীং সময়ের অনেক চলচ্চিত্রই দেখেছি ব্যবসাসফলও হয়েছে। সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমি একটা বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনই দেখছি। তবে আমি আরও কিছু পরিবর্তন প্রত্যাশা করি।

চলচ্চিত্রের কিছু বিষয়ে আমি বারবারই বলার চেষ্টা করছি, যে পরিবর্তন মূলত আমি চাই, আমাদের এখানে নারীপ্রধান চরিত্রের ঘাটতি। আমাদের এই জায়গাটা ভীষণ দুর্বল। নারীকেন্দ্রিক কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও সেটার পার্সপেক্টিভ, পয়েন্ট অব ভিউটা বা লেন্সটা হয় পুরুষের বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার। এই জায়গাটা আমাকে এক ধরনের কষ্ট দেয় বা পীড়া দেয়। এই জায়গাটার পরিবর্তন ভীষণ জরুরি মনে করি। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরতে হলে পুরুষের দৃষ্টি থেকে দেখার জায়গা থেকে বের হতে হবে। এই পরিবর্তনটা যদি সম্ভব হয় তাহলে আমরা আরও বেশি বিশ্বায়নের দিকে এগিয়ে যাব, আরও বেশি সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারব। যেহেতু আমরা বলে থাকি যে, চলচ্চিত্র সমাজ পরিবর্তনের একটা মাধ্যম। এসব জায়গায় নির্মাতারা যদি আরও সচেতনভাবে ফোকাস করেন, তাহলে আমাদের চলচ্চিত্রে আরেকটা লেয়ার সংযুক্ত হবে, একটা নতুন দিক উন্মোচন হবে। এতে চলচ্চিত্রের গল্পেও বৈচিত্র্য আসবে।

ওটিটিতে আসলে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে বলতে পারি। ওটিটি প্ল্যাটফরম আসার ফলে সবচেয়ে যেটা সুবিধা হয়েছে যে আমাদের আর দেশের সীমারেখা নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না, সীমান্ত নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না, সেন্সরশিপ নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না। এমনকি, এখন আর আগের মতো বাজেট বিষয়ে নাটক বা চলচ্চিত্র নিয়ে যে ধরনের দুশ্চিন্তা করতে হতো, সেটা করতে হচ্ছে না। এখন দেশের ওটিটি কনটেন্ট বেশ ভালো বাজেট নিয়ে কাজ করছে। যদিও আমি মনে করি বাজেট আরও ভালো হলে আরও ভালো নির্মাণ সম্ভব হতো। কারণ, আমরা যদি উন্নত বিশ্বের কথা চিন্তা করি, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, সনি লিভ, এইচবিও যে বাজেটে কাজ করে, আমরা সেই বাজেটের ধারেকাছেও নেই। সেই হিসাবে আমরা খুবই স্বল্প বাজেটে কাজ করি, তারপরও আমাদের প্রোডাকশনগুলো যে মানের হচ্ছে তা আশার আলো জাগায়।

ওটিটির ফলে আমাদের গল্প বলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে, চরিত্রগুলোর মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। এখন আর শুধুই টিপিক্যাল প্রেমের গল্পে আমরা আটকে নেই। যদিও থ্রিলার, মার্ডার, মিস্ট্রি এসবের দিকে একটু বেশি ঝুঁকে যাচ্ছি আমরা। তারপরও বলব, এই প্ল্যাটফরমের জন্য নানান ধরনের গল্প বলার সুযোগ হচ্ছে। অনেক ধরনের চরিত্র এখানে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। আমি যখন নাটকে কাজ করতাম তখন এমন সুযোগ কমে গিয়েছিল।

ওটিটি আসায় নির্মাতাদের মধ্যেও এক ধরনের নতুন জোয়ার এসেছে। আমাদের এখানের নির্মাতারা অবশ্যই মেধাবী, শিল্পীরা আরও মেধাবী। কারণ আমাদের এখানে যে প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করতে হয়, যে ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কাজ করি আমরা বা করতে পারছি সেখানে এটাই এক ধরনের বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট। আমাদের প্রথম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আমাদের শেখার জায়গা নেই। আমরা যা শিখি বা করি সবই কিন্তু আমরা নিজেরা নিজেরা শিখি বা করি। আমাদের যদি একটা প্রতিষ্ঠান থাকত, শেখার জায়গা থাকত তাহলে আমাদের মেধার চর্চা করতে অনেক সহায়ক হতো। ইনস্টিটিউশনগুলো ওইভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এটার একটা ঘাটতি আছে আমাদের এখানে।

অন্যদিকে আমাদের দেশে অনেক মেধাবী শিল্পী থাকলেও তাদের সেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন। হয়তো অনেক মেধাও চর্চার অভাবে নষ্ট হচ্ছে। তবে মেধার ব্যাপারে আমি বলব চর্চাটা ভীষণ জরুরি। নিজেকে নিজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করাটা জরুরি। এই আর্থ-সমাজ ব্যবস্থার চাপে পড়ে সেই একই ঘটনা বা সেই একই গল্প বারবার বলার প্রবণতা যদি তৈরি হয় তাহলে সেটা ভীষণ দুঃখের হবে। আমরা যদি উপমহাদেশের কথাও চিন্তা করি, সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকরা ওই যুগেও ওই সময়েও তাদের সময়কে ছাপিয়ে যেতে পেরেছেন। তাদের কাজ অমর হয়ে রয়েছে।

এমন মানসিকতা যে আমি খুব বেশি মানুষের মধ্যে দেখতে পাই তা কিন্তু নয়। আমাদের সবকিছুই, চাই বা না চাই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার কারণে অর্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। যখনই আমরা অর্থটাকে প্রাধান্য দিই, তখনই শিল্প বা আমাদের বাস্তবতাকে আমরা পাশে সরিয়ে রাখি। অনেক কিছু তখন আমরা না দেখার চেষ্টা করি। এই জায়গাটা থেকে আমাদের বের হতে হবে। আমরা দেখি যে তারাই বেশি সম্মান পায় বা গুরুত্ব পায়, যারা দুর্নীতি করছে, যারা অনিয়ম করছে। আমাদের সামনে যদি দু-চারজন মানুষ আদর্শ হিসেবে দাঁড়াতে পারতেন, যারা কাজটাকে কাজের জায়গা থেকেই দেখেন; যারা পরিবর্তনটা চান, যারা মানুষের চিন্তায় কম্পন তৈরি করতে চান...! এমন মানুষের সংখ্যাটা যত বাড়বে ততবেশি কালজয়ী কাজ তৈরি হবে।

শুরুর দিকে নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে যা বলছিলাম, ওটিটি প্ল্যাটফরমের ক্ষেত্রেও তাই। আসলে আমাদের এখানে নারীকেন্দ্রিক গল্প হলেও সেটা হচ্ছে পুরুষের দৃষ্টিতে নারীকে দেখার গল্প। নারীর দৃষ্টিতে নারীকেও দেখা খুব কঠিন। কারণ নারীর দৃষ্টিতে সমাজটা যে মাত্রার কদর্যতা নিয়ে ধরা দেয়, সেটা দেখতে আর বলতে গেলে ‘কুৎসিত’ শব্দটিই মনে আসছে। সেই কুৎসিত সমাজটা মানুষ দেখতে চায় কি না সেটাও ভাবার বিষয়। আমার দৃষ্টিতে আমার বাবার চরিত্রটা কেমন, আমার ভাইয়ের চরিত্রটা কেমন, আমার সঙ্গীর চরিত্রটা কেমন সেটা কিন্তু আমরা দেখতে পাই না। আমরা যা দেখতে পাই সেটা প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সৃষ্ট পুরুষ চোখে দেখা দৃশ্য ও তার চিন্তা। এই যুগে আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু আদৌ সেটাকে কতটা বিশ্বাস করে চর্চা করছি এসব জায়গা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে। ইদানীং এমন কিছু সিনেমা সুপারহিট হচ্ছে, সেসব সিনেমায় নারীবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। এসব সিনেমায় নারীকে কেবল বস্তু এবং খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এমন কাজই মানুষ গ্রহণ করছে।

আমি মনে করি, এখানে দর্শকেরও একটা বড় ভূমিকা আছে। ইতিবাচক পরিবর্তনে আমাদের সঙ্গে তাদেরও একাত্ম হওয়ার দরকার। বিনোদন তো বিনোদনই। কিন্তু এই বিনোদনের মধ্যে যেন আমরা আমাদের বিবেচনাকে কাজে লাগাতে পারি, সেটাও যেন মাথায় থাকে। দর্শকদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তনেরও জায়গা রয়েছে। তারা যখন বাইরের কাজ দেখছেন তখন এক ধরনের মনমানসিকতা পোষণ করছেন, যখন আমাদের কাজ দেখছেন তখন আরেক ধরনের মনমানসিকতা পোষণ করছেন এটা কেন?

অবশেষে যে কথা বলতে চাই এমনিতেই বিশ্ব জুড়ে পুঁজির যে দাপট, পুরুষতান্ত্রিকতার যে দাপট, সেটার প্রভাব তো রয়েই যায়। এটা থেকে বের হওয়াটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। উদাহরণ রেহানা মরিয়ম নূর। যদিও নানা ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তবুও তো শেষ পর্যন্ত একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে। আশা করি আমাদের সামনের সময়টা আমরা আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র ও ওটিটিতে কনটেন্টে দেখতে পাবো।

অনুলিখন : মাহতাব হোসেন