কিছুদিন পরপরই খাদ্যাভাবে বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে হানা দেওয়ার খবর আমাদের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়, খাবারের অভাবে বন্যহাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর সংবাদ শিরোনাম হয়। তবুও এ বিষয়ে আমরা সচেতন হই না। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে বন তথা বনভূমি ও বন্যপ্রাণী এবং বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণে কতটা সফল বাংলাদেশ? বিশ্বের সচেতন ও সংবেদনশীল অংশ যেখানে বন্যপ্রাণী রক্ষা ও সংরক্ষণে তৎপর, এর বিপরীতে আমাদের দেশে যখন বনভূমি, বন্যপ্রাণীকে যখন মানুষের মুখোমুখি হতে হয় তখন এই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে।
দুই দশক আগেও আমাদের বাংলাদেশের মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের বন সংলগ্ন চা বাগানগুলোতে অনেক টিলা, পতিত সমতল জমি এবং অনাবাদি অংশ পড়ে থাকতে দেখা যেত। প্রাকৃতিক বনের মতোই সেগুলো নানান গাছগাছালি এবং ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ থাকত। যা বন্যপ্রাণীদের বিচরণ, প্রজনন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মূল বনের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ পকেট হিসেবে কাজ করত।
প্রতি বছর অনাবাদি সেই জায়গাগুলোর গাছপালা, ঝোপঝাড় কেটে, আগুনে পুড়িয়ে পরিষ্কার করে নতুন করে চা বাগান নয়তো রাবার বাগান করা হয়। ফলে বিগত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনক হারে প্রায় না-ই হয়ে গিয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ পকেটগুলো। বর্তমানে হাতেগোনা যে গুটিকয়েক ছোট ছোট পকেট আছে সেগুলোও খুব শিগগিরই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথে।
চোখের সামনেই দেখতে হয়েছে একদিকে বনভূমির উজাড় ও বেদখল হওয়া, আরেকদিকে বন সংলগ্ন পকেটগুলোর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। এই পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে অধিকাংশ বন্যপ্রাণীর টিকে থাকার বিষয়টিকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। ইতিমধ্যে দেরি হয়ে যাওয়ার পরও এখনো কর্তৃপক্ষ জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে এসে রক্ষা করতে পারে বনভূমি ও বন্যপ্রাণী। প্রতিটা চা বাগানের মোট আয়তনের অন্তত ১০ শতাংশ জায়গা অনাবাদি রেখে বন্যপ্রাণীদের জন্য পকেট হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি। নয়তো নিকট অতীতে শালবন থেকে সবুজ ময়ূর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতোন অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রাণীই হয়তো আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলব।
২০১৫ সালের বন বিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন নেচার (আইইউসিএন) পরিচালিত এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে স্থায়ী এবং ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে বিচরণকারী হাতিসহ দেশে মোট হাতির সংখ্যা ছিল ২৭৯ থেকে ৩২৭টি। একসময় বাংলাদেশের ১২টি এলাকাকে হাতি চলাচলের করিডর হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল। হাতিরা নিরাপদে, মানুষের ক্ষতি না করে, লোকালয়ে চলে না এসে এই করিডোরগুলো দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে বনভূমি উদ্ধার করে ক্ষেত-খামার, বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলায় হাতির নিরাপদ চলাচলের সেই করিডরগুলোর বেশিরভাগই বিলুপ্ত। ফলে, খাদ্যাভাব হোক বা পথ হারিয়ে, চলার পথ না পেয়ে কিংবা ভুল করে হোক যে কোনো কারণেই লোকালয়ে চলে আসছে বন্যহাতি। হাতির সঙ্গে সংঘাত হচ্ছে মানুষের। ক্ষেতের ফসল থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, স্থাপনার ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও। ২০১৪-২০২৩ এই ৯ বছরে ৩৫ জন মানুষ হাতির আক্রমণে এবং কেবল ২০২১ সালেই সারা দেশে মোট ৩০টি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
বছরজুড়ে এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে বিরাজ করে বন্যহাতির তীব্র আতঙ্ক। সীমান্ত ও পাহাড়ি এই জনপদে সন্ধ্যা নামে হাতির আতঙ্কে। ফলে যার কাছে যা আছে তাই নিয়েই চলে হাতি প্রতিরোধ। রাতে বেজে ওঠে ঢাকঢোল, কাঁসার বাদ্য। বাজে বাঁশি। হাতির চলাচলের পথগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। হাতি-মানুষের এই দ্বন্দ্ব মোটেই কাম্য নয়। পরিস্থিতি এমন যে, হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে স্থানীয়দের নিয়ে দশ বছর মেয়াদি প্রকল্প ‘এলিফেন্ট রেসপন্স টিম’ গঠন করেছে আইইউসিএন। এছাড়া, আমরা প্রায়শই গণমাধ্যমে জানতে পারি বনে খাবার না পেয়ে লোকালয়ে হানা দিয়েছে বানরের দল। এতে একদিকে ক্ষেত, ফসল, ফল-ফলাদির যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার খবর জানতে পারছি। এছাড়া বনের মধ্য দিয়ে এবং লোকালয়ে বৈদ্যুতিক লাইনের তারে জড়িয়ে বানরের মৃত্যুর খবরও আমাদের ব্যথিত করে।
লাওয়াছড়া এবং সাতছড়ির মতো সমৃদ্ধ বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে ব্যস্ত সড়কপথ। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বন্যপ্রাণী মারা পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায়। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ মৌলভীবাজারের উদ্যোগে দুই বনের সড়কপথে সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালানো হয়েছিল বিগত বছরগুলোতে। দুঃখজনকভাবে সেটিও এখন নিয়মিত নয়।
আশার কথা, শেরপুরে হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে হাতির করিডর চিহ্নিতকরণ এবং হাতির অভয়াশ্রম তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার। শেরপুরের তিনটি উপজেলায় ভারত সীমান্তের সঙ্গে ৪০ কিলোমিটার বনাঞ্চল রয়েছে। এই বনাঞ্চলে প্রতিনিয়ত হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব চলছে এবং এতে উভয়ে মারাও পড়ছে। হাতির অভয়ারণ্য তৈরি হলে এ দ্বন্দ্ব কমতে পারে।
হাতি ও বানরের চেয়ে পাখিদের অবস্থা বোধ হয় খানিকটা ভালো। ভাগ্যিস মানুষ ভূমি ছেড়ে আকাশ দখল নিতে পারে না, সেটা সম্ভব হলে পাখিদের অবস্থাও একই রকম হতে পারত। একটা সময় গণহারে সারা দেশেই বিভিন্ন আবাসিক এবং পরিযায়ী পাখি শিকার হতো। আশার কথা হচ্ছে খুব ধীরগতিতে হলেও পাখির প্রতি আমাদের আচরণে পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন এ নিয়ে সচেতন হয়ে উঠছে। তারা পাখিসহ যে কোনো বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করছে। ব্যক্তি উদ্যোগে এবং দলগতভাবে অনেকেই প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় এগিয়ে আসছে। কোথাও কোনো পাখি বা বন্যপ্রাণী হত্যা হলে প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রশাসনও আগের মতো নির্লিপ্ত না থেকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট নিয়মিত বন্যপ্রাণী পাচার এবং আটকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে।
আমাদের বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন ২০১২ আছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকরের কারণে এর প্রয়োগে অনেক সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। বনভূমির সীমানার বাইরে কোথাও বন্যপ্রাণী বা পাখি শিকার হলে উক্ত উপজেলার কোনো নির্বাহী মাজিস্ট্রেট ছাড়া তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে দোষীদের আটক করে সাজা নিশ্চিত করতে পারে না বন বিভাগ। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংশ্লিষ্ট উপজেলার ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে সময় মতো শিকারিদের হাতেনাতে ধরা সম্ভব হয় না। আবার বাঘ, হাতি, হরিণ, ভালুক জাতীয় প্রাণী ছাড়া বেশির ভাগ প্রাণীর ক্ষেত্রে বিশেষ করে পাখি শিকারের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দেখা যায় আদালতে আমল অযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে সহজে পার পেয়ে যায় অপরাধী। যেটা দেখে আরও শিকারে উৎসাহিত হয় অনেকেই। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে অন্তত সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধ দমনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার কথা যৌক্তিকভাবেই চিন্তা করা যেতে পারে। এতে বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধ দমন করা অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করি।
অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেলেও ২০১৮ সালে আমি, সোহেল শ্যাম পাপ্পু, কাজল হাজরা, রিপন দে, শিমুল তরফদার, রুপক দাস, রাজিব দেব, পিয়াস দাসসহ কয়েকজন মিলে ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকুক আমাদের বন প্রাণ’ স্লোগান সামনে রেখে গঠন করি ‘স্ট্যান্ড ফর আওয়ার এন্ডেঞ্জার্ড ওয়াইল্ড লাইফ’ (টিম ঝঊড)। আমরা অজস্র বন্যপ্রাণী উদ্ধার, অবমুক্ত ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে দলগতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন ধীরে ধীরে গবেষক, সংবাদকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অতীতে যেকোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের বিশেষ করে মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখন বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ধৈর্যশীল। কোথাও কোনো বন্যপ্রাণষী ধরা পড়লে বা শিকার হলে এখন টিম ঝঊড অথবা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। গণমাধ্যমও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করি। বিভিন্ন প্রজাতির আবাসিক এবং পরিযায়ী দুর্লভ পাখিদের নিরাপদ প্রজনন এবং বিচরণ ক্ষেত্র কুরমা চা বাগানের ছনখোলা (অনাবাদি ঘেসো জমি)। সেখানে চা বাগান সম্প্রসারণের কার্যক্রম শুরু হলে আমরা যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব সহকারে ছনখোলা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়, ঠাই হয় সম্পাদকীয়তে। পরে বন বিভাগের হস্তক্ষেপে জায়গাটি রক্ষা পায়। স্থানীয় জনগণও ব্যাপক সমর্থন জানায় এই কাজে।
লেখক : পরিবেশকর্মী, বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী
ফাউন্ডার অ্যডমিন- SEW
