প্রাথমিকভাবে লেখার বিষয়বস্তুটি একটু গতানুগতিকের বাইরে হওয়াতে ভালোই লাগল। কিন্তু লেখার জন্য ভাবতে গিয়ে দেখলাম বিষয় হিসেবে শ্রুতিমধুর হলেও এমন ক্ষেত্রে চিন্তার ফসল ফলানো কঠিন। প্রথমেই আমি নিজে শিশু হিসেবে কেমন ছিলাম সেটা ভাবতে গেলাম। মনে হলো সেটা তো শুধু ব্যক্তি আমি, গোটা কয়েক এমন ‘ব্যক্তি আমি’ দিয়ে সেকালের ‘আমরা’দের দৃষ্টিভঙ্গি মাপা যায় না। বড়দের দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রেণিবদ্ধ করা গেলেও শিশুদের ক্ষেত্রে তা কঠিন। তার চেয়েও বড় কথা হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি কি আদৌ আমরা কখনো জানার চেষ্টা করেছি? কিংবা শিশুর স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির পরিবেশ কি আমরা শিশুকে তৈরি করে দিই? ‘তোমার কী মনে হয়? তুমি কী ভাবো?’ এমন প্রশ্ন কি অভিভাবক হিসেবে আমরা শিশুকে কদাচিৎ কখনো করি? অথবা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও কি এত দিনে কখনো শিশুর মতামত শুনতে চেয়েছে? শিশুর যে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে সেটাও কি আমরা কখনো ভেবেছি?
আমাদের পরিবারে, সমাজে, শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু শুধুই গ্রহীতা। সাধারণত তার মতামত, তার চিন্তা কখনো জানতেই চাওয়া হয় না। সে যদি নিজে থেকেও কোথাও মত দিতে চায় সেটাকে খুব একটা ঠিক গ্রাহ্য করা হয় না। যদি কখনো জানতে চাওয়া হয় দেখা যাবে তার মতের পেছনে শিশুর নিজস্ব একটি যুক্তি আছে। যেটা মাঝে মাঝে চমকপ্রদও হতে পারে! আমি একবার একটি শিশুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ছোট, তুমি মেকআপ দিয়ে কী করবে? সে বলেছিল, কারণ রং আমার ভালো লাগে! আমি এভাবে ভাবিনি কখনো! বরং শিশুর মেকআপপ্রীতিকে সর্বদা একচোখাভাবে দেখে এসেছি। সুতরাং শিশুর কাছ থেকেও শেখার আছে।
আবার শিশুদের আঁকা ছবিকে আনাড়ি ভেবে আমরা তাদের ছবি আঁকা ‘শেখাতে’ চাই। কিন্তু, ছবি আঁকার গুরু, যাদের আমি দেখেছি, তারা কিন্তু কখনোই শিশুকে ছবি আঁকা ‘শেখাতে’ চান না। তারা চান শিশুর শৈল্পিক সত্তাটি যেন নিজের মতো করে বিকশিত হয়। এ রকমই এক শিক্ষক বলছিলেন, ‘শিশু কিন্তু তার আঁকা ছবির ব্যাখ্যা দিতে পারে। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কেন পাতায় এই রঙ দিলে, সে কিন্তু উত্তর দেয়, কোথাও না কোথাও এই রং সে দেখেছে।’ অথচ আমাদের বড়দের চোখে গাছের পাতার রং শুধুই সবুজ। শিশুর যুক্তি শোনার পর মনে হয় আরে হ্যাঁ তাই তো! লাল কিংবা হলুদ এমনকি গোলাপি পাতাও তো আছে!! শিশুদের কাঁচা চোখ এমন অনেক কিছুই দেখে যেখানে আমাদের অভ্যস্ত চোখ পৌঁছে না। শিশুর আঁকা ছবি নিয়ে আরেকটা গল্প বলা যাক। গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আমার দারুণ কিছু সময় কেটেছে। একবার স্বাধীনতা দিবসে শিশুদের আঁকা ছবি প্রদর্শনের জন্য আমরা টাঙিয়ে দিয়েছিলাম। সবাই মিলে দেখছি, এমন সময় একটি শিশুর আঁকা ছবিতে চোখ গেল আমার এক সহকর্মীর। তিনি দেখালেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি এঁকেছে একজন। সেখানে গাছের আড়াল থেকে যুদ্ধ করছে একজন মুক্তিযোদ্ধা আর পাক-হানাদার বাহিনীর সৈন্য। মুক্তিযোদ্ধার পরনে লুঙ্গি আর পাক-হানাদার বাহিনীর পরনে প্যান্ট। শিশুর এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ দেখে আমরা অবাক হলাম। ক্লাসের অভিজ্ঞতা বলা যাক। বিজ্ঞান ক্লাসে শিশুদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতাম। ফলে মাঝে মাঝে দারুণ মজার সব প্রশ্ন আসত। এক দিন মাহাদি বলল, ম্যাডাম বাতাসে তো অনেক ধরনের গ্যাস থাকে, তাহলে বাতাস থেকে শুধু অক্সিজেন কীভাবে নিই? আমার মনে হলো আসলেই তো! এভাবে তো কখনো ভাবিইনি! আবার তাসিন জানতে চাইল, আপা সূর্য গরম কিন্তু মেঘ ঠা-া কেন? মুগ্ধ হয়েছিলাম চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এমন দারুণ প্রশ্ন শোনে!
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, শিশুর চোখ দিয়ে আমাদের চারপাশকে নতুন করে দেখার সুযোগ আমাদের আছে, যা থেকে আমরা বড়রা বরাবরই নিজেদের বঞ্চিত করছি। যেহেতু আমরা শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের সুযোগ তৈরি না করে বরং তাদের ওপর আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিই, তাই অনেক ক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে তার সামাজিক শ্রেণি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। কিন্তু মানুষ হিসেবে সবার মধ্যেই চিন্তার ভাঙাগড়া চলতে থাকে, হোক সে বড় আর ছোট মানুষ। তাই আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি শিশুর বড়দের ‘চাপিয়ে দেওয়া দৃষ্টিভঙ্গি’র প্রভাব কাটিয়ে নিজের ভঙ্গিটা খুঁজে পেতে যেন অনেকটা সময় লেগে যায়। অথবা বেড়ে উঠতে উঠতে, বড়দের চাপে একসময় শিশু তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই হারিয়ে ফেলে আর সবার মতোই শুধু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। হয়তো এজন্যই আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখি পরিবর্তনহীন, গড় দৃষ্টিভঙ্গির সমাজ। অথচ অভিভাবক হিসেবে আমাদের কাজ হলো নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া না বরং তার চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কাহলিল জিবরানের কবিতায়ও আমরা এই কথাই পাই
You may give them your love but not your thoughts
For they have their own thoughts...
আশার কথা, আমরা এখন শিশুদের এই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের খোঁজ করা শুরুর চেষ্টা করছি। আমাদের হাতে এসেছে ২০২২ সালের শিক্ষাক্রম রূপরেখা। শিক্ষাক্রমে একবার চোখ বুলালেই আমরা বুঝতে পারব বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এই পথেই হাঁটতে চলেছে। আমরা এখন শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই। শিক্ষাক্রমের ফোকাস পরিবর্তিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের এখন ‘গ্রহীতা’র পরিবর্তে ‘উৎপাদনকারী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানে শিশুকে নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনে, প্রশ্ন করতে, মতামত প্রদানে, সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দশ বছর পর এই নতুন শিক্ষাক্রম হয়তো সত্যিই আমাদের নবীনের রঙিন চিন্তাজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে। এসডিজির অন্যতম অঙ্গীকার হলো ‘খবধাব হড় ড়হব নবযরহফ.’ আমরা শিশুদের আমাদের পেছনে রেখে নয় বরং আমাদের পাশে আমাদের বন্ধু, আমাদের পথচলার সঙ্গী হিসেবে তাদের অন্তরের প্রাচুর্যকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।
লেখাটা শেষ করছি অঞ্জন দত্তের ‘বড়দের ব্যাপার’ গানটি দিয়ে। আপনারাই নির্ধারণ করবেন গানটা আসলে কাদের জন্য লেখা, ছোটদের জন্য নাকি বড়দের?
ক্রমশ হচ্ছো তুমি বড়
একটু একটু করে রোজ।
ক্রমশ হচ্ছো বড়সড়
অঙ্ক ইতিহাস ভূগোল।
মোজাটা ছোট-বড় হলেও
জগৎটা ছোট-বড় নয়,
তোমার লেখাপড়ার বাইরেও রোজ কত কিছু হয়।
তুমি জানছো সবকিছু,
জানাচ্ছে বাবা মা টিভি।
এখন প্রশ্ন হলো একটাই
তোমার নিজের মতটা কী?
তোমার মতামত জরুরি
হোক তা বড়দের ব্যাপার,
কারণ তুমিও হচ্ছো বড়
জগৎটা ক্রমশ তোমার।
লেখক : প্রশিক্ষক, প্রাথমিক শিক্ষক
প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট