নারী

মায়েরা সবসময়ই ভালো...

নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাকে লিখতে বলা হয়েছে। লেখার জন্য বিষয়টি নিঃসন্দেহে আগ্রহের জায়গা। যে কারও জন্যই। আমি যদি অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী হতাম, তাহলে এ বিষয় নিয়ে লিখতে আমার বেশি চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু জীবনের এ পর্যায়ে এসে চিন্তাভাবনা ছাড়া চট করে কিছু লিখে ফেলা যায় না। লেখালেখি একটি দায়িত্বশীল কাজ, ছেলেখেলা নয়।

নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির যেকোনো একটা দিক নিয়ে শুরু করতে হলে বলতে হবে, নারীত্বের সবচেয়ে মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন হয় মাতৃত্বকে ঘিরে। নারীত্বের অন্য নাম মাতৃত্ব। নারীকে বলা হয় মায়ের জাত। সেটা সমস্যা নয়, নিজের শরীর ছিঁড়েফুঁড়ে সন্তান জন্ম দেয় নারী। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, মাতৃত্বের মধ্যেই বেঁধে ফেলা হয় নারীর অন্য সব পরিচয়কে। নারী ছাড়া অন্যান্য লৈঙ্গিক পরিচয়ের মানুষরা, যেমন পুরুষ বা অন্যরা, যারা নিজ শরীরে সন্তান ধারণ করেন না, তাদের কখনো এ রকম একটি জৈবিক ও জটিল দিকের মধ্যে এভাবে ডুবে থাকতে হয় না, বিলীন হয়ে যেতে হয় না।

মাতৃত্ব দিয়ে নারীকে বিচার করলে অসুবিধা কোথায়?এ প্রশ্ন কারও মনে আসতেই পারে। অসুবিধা আসলে থাকত না যদি মাতৃত্ব নারীর জন্য চয়েস হতো বা অপশন হতো। আমার এক বন্ধুর দাবি, আমার লেখায় অনেক ইংরেজি শব্দ থাকে। এখানে মাতৃত্ব নারীর জন্য ‘পছন্দ’ বা ‘বিকল্প’ বললে আসলে কিছুই বোঝায় না। যদি প্রশ্ন করা হয়, নারীর জন্য মা হওয়া ছাড়া অন্য কোনোভাবে আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব কি না? উত্তর হচ্ছে, না। এখনো এ সময় এ সমাজে এই জনাকীর্ণ পৃথিবীতে নারী নিজের পছন্দে মা হতে বা না-হতে পারে না। জগতে অনেক নারী নিজের পছন্দে সন্তান ধারণ করেন না, না করেও বেঁচে থাকতে পারেন। কিন্তু তাদের দিকে প্রশ্নের তীর ছুড়ে মারা হয়, তা তারা এড়াতে পারেন না।

পুরুষের জন্য বিষয়টি এমন নয়। কোনো পুরুষ আজীবন সঙ্গীবিহীন থাকলে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কেন একা থাকেন। যেমন কবি হেলাল হাফিজ বা লেখক শহীদুল জহিরকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। কিন্তু সেসব প্রশ্ন যৌনতাকেন্দ্রিক, যৌন চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনোভাবেই প্রজনন বা পুনরুৎপাদন সম্পর্কিত নয়। অন্যদিকে কোনো নারী যদি ইচ্ছে করে বিয়ে না করেন বা সন্তান ধারণ না করেন অথবা বিয়ে করেও সন্তান ধারণ না করেন, দরকারি নয় যে তিনি কোনো বিখ্যাত কবি বা লেখক, তাকে জিজ্ঞেস করাই হয়, তিনি কেন ‘মা’ হলেন না!

লেখা শুরু হয়েছিল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। নারীর প্রতি সমাজে দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, তার এমন একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, তার শরীরের মধ্যে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধারণ করতে চান কি না এমন প্রশ্নও খুব সহজে করে ফেলা যায়। নারীর শরীরের সীমানা যতটা জরুরি বলে মনে করা হয়, তার মনের বা ইচ্ছার বা যাপনের বিষয়ে অনধিকার চর্চা যেন ততটাই সহজ।

মাতৃত্বের সঙ্গে নারীর গৌরব এবং অসহায়ত্ব মিলিয়ে-মিশিয়ে এমন এক উপস্থাপন ও চর্চা সমাজে সর্বদা জারি থাকে যে, এর বাইরে বের হওয়া নারীর জন্য শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। মহীয়সী নারীরা এর থেকে বাইরে থাকতে পারেন বটে, তাপসী রাবেয়া, মীরা বাঈ, আবিদা পারভীন বা এমন মহাপ্রতিভাধর জ্ঞানী ও গুণী নারী এই বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে পারেন। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ নারী, আমাদের আজীবন এ প্রশ্নের মোকাবিলা করে যেতে হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রূপান্তরকামী নারীদের অধিকার নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা এবং সমালোচনা চলছে। রূপান্তরকামী নারী নিয়ে সমাজের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও মাতৃত্বের মাপকাঠিতে বা নিক্তিতে মাপা হয় বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। সন্তান ধারণের উপযোগিতার ভিত্তিতে যেহেতু নারীর অস্তিত্বের বা পরিচয়ের উচ্চতা, শ্রেষ্ঠতা নির্ভর করে, ফলে রূপান্তরকামী নারীদের ‘নারী’ হিসেবে স্বীকারে নারাজ থাকে পুরুষাধিপত্যবাদী সমাজ মনন।

নারীর প্রতি সমাজ নির্মিত দৃষ্টিভঙ্গি এমন যেন মাতৃত্ব ও নারীত্ব একে-অন্যের পরিপূরক নয় বরং সমার্থক। মাতৃত্ব এবং নারীত্ব কেমন করে এক সুতায় বাঁধা থাকে, তা নিয়ে একটা উদাহরণ দিতে চাই। মাতৃত্বের মহিমা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রধান অবয়ব কিন্তু দুর্বল বা অসহায় হিসেবেই থাকে। যেমন : সুন্দরবন বাংলাদেশকে নানা রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচায় বলে সুন্দরবনকে বলা হয় মায়ের মতো। মা আমাদের কোলে আগলে রক্ষা করবে বলেই নয় শুধু। বনাঞ্চল মানুষের হাতে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বলেও এই মায়ের মতো আখ্যা পায় সুন্দরবন। এই পুরুষের দৃষ্টিতে দেখা দুনিয়ায়, যা কিছু বিপন্ন, যা কিছু অসহায়। তাকেই বলা হয়ে থাকে মা। বাংলায় কবিত্ব করে বলা হয় জনমদুখী মা। বিদেশি শাসনের কবলে পড়া জন্মভূমিকে মাতৃভূমি বলে, দেশমাতৃকা বলে আখ্যায়িত করে দেশপ্রেমকে উজ্জীবিত করা হতো সেই স্বদেশি আমল থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত।

মাদার নেচার বা ধরিত্রী মাতা বলে মহান মহান কান্নাকাটি জারি থাকলেও প্রকৃতিকেও মায়ের মতনই অবহেলা ও শোষণ করে বেঁচে থাকে এই পুঁজিবাদী এবং পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতা। মা মা নাম করে নারীকে যেমন ঠকিয়ে দেওয়া হয় আজীবন, প্রকৃতিকেও তেমনটাই শোষণ করা হয়। ইকোফেমিনিস্টরা হয়তো ক্ষুন্ন হতে পারেন, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে নারী ও মাটি, নারী ও পৃথিবী, নারী ও প্রকৃতি, নারী ও নদী, নারী ও ফুল, নারী ও ফসল ইত্যাদি উপমাকে, কাব্যিকতাকে সমস্যাজনক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখি। কেননা, বিপন্ন, শোষিত, বঞ্চিত ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করতে থাকলে নারীর প্রতি আজন্ম শোষণের ক্ষেত্রগুলো আরও বিস্তৃত হতে থাকে।

দৃষ্টিভঙ্গি এমন একটি বিষয় যা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রকমের হয়। কিন্তু নারীর পরিচয় ও প্রাধান্য মানবসভ্যতার শুরু থেকে শরীর ও মাতৃত্বে আটকে রয়েছে। ফলে, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলাপে এই বিষয়গুলো বারবার আলোচনায় চলেই আসে। কার্ল মার্কসের নারীজাতির ঐতিহাসিক মহাপরাজয়ের বয়ানই সত্য বলে মনে হতে থাকে। সম্ভবত এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্তি নেই নারীর।

লেখক : কবি ও লেখক