খেলাধুলা

খেলা এখন মাঠ ছেড়ে পর্দায়

বন্ধুদের আড্ডায় দুঃসংবাদটা পেলাম। আমাদের এক প্রিয় বন্ধুর পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। কোনো প্রশ্ন ছাড়া একেবারে নিশ্চিত অনুমানে আরেক বন্ধু আক্ষেপ করে বলল, এ বয়সে ফুটবল খেলতে যাওয়াটা ঠিক না। বছর চল্লিশের আরও কয়েকজন মানুষ এর সঙ্গে একমত হলেন। একজন অবশ্য বললেন, আমাদের জীবনে আর আনন্দ কই? একটু ফুটবলও খেলা যাবে না!

এ আলোচনায় বাদ সেধে বসেন যেই বাসায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, সেই বাসার কর্তার বছর দশেক বয়সী ভাগ্নে রাইয়ান। আদনান মামা ফুটবল খেলে? কোন ক্লাবে খেলে? ওনার খেলা তো কখনো টিভিতে দেখি নাই!

এই আপাত নিরীহ প্রশ্নটি হুট করেই দুই প্রজন্মের দুস্তর ব্যবধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। দুনিয়াকে দেখার বিস্তর ফারাকের কথা মনে করিয়ে দেয়। খেলাধুলা, বিশেষত প্রতিষ্ঠিত খেলা নিয়ে দুই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট ফারাক বুঝিয়ে দেয়।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটা বড় অংশের কাছে খেলাধুলা মানে আসলে টিভিতে দেখানো একটা পারফরম্যান্স। সিনেমার মতো, নাটকের মতো। ফুটবল খেলায় লাথি মারায় যে রোমাঞ্চ, ক্রিকেট মাঠে সারা দিন বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগের যে অপার্থিব ব্যাপার তা এই বেচারাদের জন্য বোঝা অসম্ভব। কবির সুমন তার পাড়ার ছোট্ট পার্ক গানে বলেছিলেন, ঘাসের অভাব পরোয়া করে না সবুজ বাচ্চাগুলো। সুমন যখন গান লেখেন তখন ধূসর, ধুলামাখা হলেও কিছু পার্ক বা খেলার মাঠ ছিল। এখন সেগুলোও প্রায় নেই হয়ে গেছে।

খেলা ব্যাপারটা মূলত নিজের আনন্দ। জাগতিক অন্যান্য ব্যাপার থেকে নিজেকে দূরে রাখা সেই দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষায় খেলার সঙ্গে ধুলা শব্দটি যোগ হয়ে যে ব্যঞ্জনা তৈরি হয়েছিল, তা ওই শারীরিক বোধটার কারণেই। কিন্তু ক্রমশ টেলিভিশনে দেখানো একটা স্পেক্টাকল হয়ে উঠে খেলায় যে বোধ নাই হয়ে যাচ্ছে।

এর চেয়েও বড় পরিবর্তন টের পাওয়া যায় যদি আমরা খেলার সংজ্ঞায় ফিরে যাই। জগতে সব প্রাণী খেলাধুলা করে বলে বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন। যে কাজে আমার আপাত কোনো বস্তুগত লাভ হয় না, কেবল শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়, সংজ্ঞানুসারে তা-ই খেলা। আদিকাল থেকে সমাজে খেলাকে এভাবে দেখা হয়েছে।

কিন্তু আদনান মামা কোন ক্লাবে খেলে? ওনার খেলা তো কখনো টিভিতে দেখি নাই! এ প্রশ্ন, এই দৃষ্টিভঙ্গি দুম করে যেন খেলাকে লাভালাভের ঊর্ধ্বে থাকা অবস্থান থেকে টেনে বাণিজ্যের কাঠামোয় নিয়ে আসে।

খেলা বিষয়টা আর কেবল আনন্দের জন্য বা নিজের তৃপ্তির বিষয় থাকে না। বিরাট একটা বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞের অংশ হয়ে যায়। খেলোয়াড়রা হন টাকা কামানোর যন্ত্র, আর দর্শক হয়ে পড়েন ভোক্তা। স্বাভাবিকভাবে খেলা বলতে যে এক ধরনের নির্দোষ, লাভালাভহীন ব্যাপার ছিল তা আর থাকে না। কোটি কোটি টাকার পণ্য হয়ে ওঠা খেলায় ‘জেতা-হারা কোনো ব্যাপার না’ এ ধরনের দর্শন আর প্রযোজ্য হয় না। খেলোয়াড়দের প্রতিদিন জেতার জন্য নামতে হয়, যন্ত্রের মতো। একটা দিনের তরেও থামা যাবে না। আর দর্শকদের চাহিদাও যেন পুঁজিবাদের প্রবৃদ্ধির মতো, কোনোভাবে শান্ত থাকা যাবে না। একটা দিনের তরেও হার মেনে নেওয়া যাবে না।

আশ্চর্যজনকভাবে, যে খেলাধুলা মানুষকে শারীরিক আর মানসিক প্রশান্তি দিত যুগের পর যুগ, তা হয়ে ওঠে ঝাঁজালো উত্তেজনার জ্বালানি। যে খেলাধুলা পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য বাড়ানোর উপলক্ষ ছিল, তা হয়ে ওঠে ঘৃণা ছড়ানোর মাধ্যম। উগ্র জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ ছড়াতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খেলা।

এটা সত্যি যে, খেলাকে এভাবে ব্যবহারের চেষ্টাটা নতুন না। রোমান শাসকরা বলত ব্রেড অ্যান্ড সার্কাস। ওরওয়েল বলতেন, ফুটবল দিয়ে শোষিত মানুষকে ভুলিয়ে রাখা যায়। তবে, তখনো খেলা ব্যাপারটা হরেদরে গণমানুষের নিজের শরীর এবং শারীরিক উত্তেজনার ব্যাপার ছিল। পুরোপুরি টেলিভিশনকেন্দ্রিক বাণিজ্য হয়ে ওঠায়, ব্রেড অ্যান্ড সার্কাসের সার্কাস হয়ে ওঠাই নতুন প্রজন্মের মূল দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে গেছে।

শুধু তা-ই নয়, খেলা দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আর অনেক মানুষ একসঙ্গে বসে খেলা দেখার সুযোগ সীমিত। ফলে, খেলা দেখতে গিয়ে যে হৃদ্যতা গড়ে উঠত, বন্ধন তৈরি হতো, তার সুযোগ কমে গেছে। ফ্রাঙ্কলিন ফয়ের তার হাউ ফুটবল এক্সপ্লেইন্স দ্য ওয়ার্ল্ড বইতে দেখান, দেশে দেশে কীভাবে সমর্থক গোষ্ঠী বড় বড় আন্দোলনের সূচনা করে। ওরওয়েলের কথার জবাব হয়ে রাজনীতিতে দেশে দেশে বড় ভূমিকা পালন করে বার্সেলোনা, রায়ো ভায়োকানো, ইন্টার মিলান, রেড স্টার বেলগ্রেডের মতো দলগুলো। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, লিভারপুলের মতো দলেরা হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতীক। এমনকি আমাদের দেশেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আবাহনী আর মোহামেডানের সমর্থকদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ব্রাদার্সের মতো ক্লাব তো গড়েই ওঠে একপাল রাজনীতিসচেতন তরুণের হাতে। আর কলকাতা মোহামেডান! মুসলমানের অধিকার আদায়ে এ ক্লাবের ভূমিকা বলতে গেলে কয়েকটা বই লেখা লাগবে।

ফলত, ফুটবলসহ বেশিরভাগ দলীয় খেলায় দর্শকের সামষ্টিক পরিচয় প্রায় বিলীন হয়ে গেছে আমাদের মতো দেশে। তার বদলে, স্থান করে নিয়েছে বৈশ্বিক দলগুলোর সমর্থন। আর সমর্থকগোষ্ঠীর যে বন্ধন তা মূলত অনলাইনকেন্দ্রিক। এই বৈশ্বিক সমর্থক গোষ্ঠী স্থানীয় আবেগ ঝেড়ে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে উঠছে। নতুন দুনিয়ায় দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিষ্ঠিত খেলাগুলো, যেগুলো শারীরিক আর মানসিক প্রফুল্লতা নিয়ে আসত, সেগুলোর জায়গায় ব্যক্তিগত খেলা হয়ে উঠছে ভিডিও গেমস। নানা ডিভাইসে এসব খেলা নিওলিবারেল যুগের প্রতীক হয়ে উঠছে। শারীরিক খেলার বিপরীতে এসব খেলা খেলোয়াড়ের শরীর ও মনের জন্য হানিকর এবং এই খেলা খেলোয়াড়দের অসামাজিক ও একাকী করে তোলে। এসব ভিডিও গেমস সত্যিকারের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো খেলা জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও ভিডিও গেমসের মতো এদের প্রভাব একেবারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেওয়ার মতো নয়।

খেলার সমাজতত্ত্ব, নৃ-তত্ত্ব, অর্থনীতি পর্যালোচনা করে খেলার দৃষ্টিভঙ্গি এবং খেলাকে দেখার, বোঝার দৃষ্টিভঙ্গির বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। সমাজ বুঝতেও এগুলো জরুরি। সংক্ষেপে বলা যায়, বিশ্বায়ন আর প্রযুক্তির চাপে খেলার দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে আগাপাশতলা পরিবর্তন হয়ে গেছে গত কয়েক দশকে।

লেখক : সাংবাদিক