প্রজন্ম

চটির সঙ্গে মোজা কিংবা রুচির ভিন্নতা

একটু খেয়াল করলে বিষয়টা চোখে পড়বে। বাড়িধারা, গুলশান বা উত্তরার কিছু অল্পবয়সীদের মধ্যে কৌতূহল জাগানিয়া একটা ঝোঁক দেখা যাবে। এরা হয়তো হাফ প্যান্ট বা থ্রি-কোয়ার্টার পরে আছে, পায়ে চপ্পল বা স্লিপার; অথচ মোজা এমনকি গরমকালেও!  

এরা চটির সঙ্গে মোজা পরে কেন?   

আপাতভাবে একে তুচ্ছ, নগণ্য একটা বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু ঘটনা মোটেও তেমন না। আপাত তুচ্ছ এই ঘটনা বৃহত্তর সাংস্কৃতিক রূপান্তরের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্যের যুগে ‘কঞ্জুমার প্রোডাক্ট’র বিশাল এক অংশের কেনাবেচা নির্ভর করে নানা কালচারাল ট্রেন্ডের ওপরে; আর কালচারাল ট্রেন্ড নির্ভর করে বিভিন্ন অ্যাস্থেটিক জাজমেন্টের ওপর। ফলে চপ্পলের সঙ্গে মোজা কেবল অল্প কিছু ছেলেমেয়ের বিচ্ছিন্ন রুচির বিষয় মাত্র না। সাংস্কৃতিক অভ্যাসগত নানা ফ্যাক্টর এভাবে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে। একটা উদাহরণ দিই। গ্রামের বিভিন্ন মানুষ ও ঢাকা শহরের রিকশাচালকদের লুঙ্গি পরার অভ্যাসের সঙ্গে স্মার্টফোন বা হ্যান্ডসেট বিক্রির একটি ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক আছে। আবার স্মার্টফোন পেনেট্রেশনের ওপর মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স ও টেলিকমের ডেটা বিজনেস অনেকখানি নির্ভর করে। সাংস্কৃতিক অভ্যাসগুলো এভাবে বাজারকে পরোক্ষে প্রভাবিত করে।   

স্যান্ডেল বা স্লিপারের সঙ্গে মোজা পরার ট্রেন্ড এখনো বড় কোনো কালচারাল ফেনোমেনন হয়ে ওঠেনি, সত্যি। কিন্তু ব্যাপক সাংস্কৃতিক রূপান্তরের লক্ষণ এতে প্রকাশ পায়। এই অ্যাস্থেটিক্সের নাম জেন-জি অ্যাস্থেটিক্স।

বিভিন্ন প্রজন্মের ব্যক্তির চিন্তা, কল্পনা, রুচি ও সামাজিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়া বুমার্স, জেন-এক্স, জেন-ওয়াই, মিলেনিয়ালস, জেন-আলফা ইত্যাদি নাম দিয়েছেন কালচারাল ক্রিটিকরা। তেমনই এক প্রজন্ম জেন-জি। জেন-জি বা জেনারেশন যিনেলিয়ালস বলতে বোঝানো হয় ১৯৯৫/৯৬-২০১২ সালের মধ্যে জন্মানো প্রজন্মকে। এদের বড় একটা অংশ বেড়ে উঠেছে ইন্টারনেট দুনিয়ার সমান্তরালে। ইন্টারনেট-পূর্ব দুনিয়া কেমন সেই ব্যাপারে যাদের তেমন ধারণাই নেই, তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে তার প্রভাবও পড়ছে।  প্রাইভেসি নিয়ে উদ্বিগ্নতা, আগের প্রজন্মের চেয়ে ফ্যাশন, মিউজিক ও ভিন্ন ক্যারিয়ার বেছে নেওয়া; রেট্রোম্যানিয়া বা পুরনো দিনের অ্যাস্থেটিক আদর্শে মুগ্ধতা ইত্যাদি জেন-জি এর প্রধান প্রবণতা। যা আসলে আগের প্রজন্মগুলোর চেয়ে এ প্রজন্মের ভিন্ন ওয়ার্ল্ড ভিউকে তুলে ধরে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি বিশ্লেষকরা এই নামকরণ করেছে তাদের দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ও আচরণগত প্রবণতা ব্যাখ্যা করার সুবিধার্থে। সন্দেহ নেই, এ রকম প্রজন্ম-মাফিক চিন্তায় সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রের জেন-এক্স, বুমার্স, মিলেনিয়ালস, জেন-জি, জেন-আলফা ইত্যাদি প্রজন্মগত বিভাজন তৃতীয় বিশ্বে বাংলায় খাপ খায় না। বিশ্বায়িত পুঁজির দুনিয়ায় ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির বদৌলতে ক্রমে হোমোজিনিয়াস বা সমরূপী হয়ে উঠতেছে। ফলে অন্তত দুুটি জেনারেশনে মিলবে। জেন-জি (জেনারেশন জিলেনিয়ালস যাদের জন্ম : ১৯৯৫/৯৬-২০১২)-এর একটা অংশের সঙ্গে মিলবে। আর জেন-এ (২০১২ সালে বা তার পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম– আলফা প্রজন্ম)-এর সঙ্গে আরও বেশি মিলবে। যেহেতু দুই প্রজন্ম অনেক বেশি ইন্টারনেট সংযুক্ত (বলা ভালো ইন্টারনেট জীবন এদের বাস্তব জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ), ফলে বৈশ্বিক (আসলে ইংরেজিভাষী দুনিয়া, বিশেষত আমেরিকান পপ কালচার) কালচারের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ থাকে। ফলে বাংলাদেশ বা ভারতের জেন-এ এর সঙ্গে আমেরিকান জেন-এ এর অ্যাস্থেটিক্সে তফাত খুব বেশি হবে না। ফলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক তথা হোমোজিনিয়াস এক জেন-এ পাচ্ছি। 

জেন-এ এর একটা নমুনা দিই। আপনার ফ্যামিলিতে ১৪/১৫ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়ে থাকলে, গ্রাম কিংবা শহরে যেখানেই হোক, খোঁজ নিয়ে দেখবেন, এদের প্রায় সবাই ইউটিউব ভিডিও স্পিড বাড়ায়ে দেখে। এরা সুপার-ফাস্ট কনটেন্ট কঞ্জুমার। কিংবা বাংলায় জেন-জি অ্যাস্থেটিক্স পপুলার হলে নির্দিষ্ট ধরনের কালচারাল প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের কনজাম্পশন বাড়বে। একটা স্থূল উদাহরণ হচ্ছে, জেন-জি এর অ্যাস্থেটিক্স বাড়া মানে দেশে মোজার বিক্রি বাড়বে। ‘আমার কিছু করতে ভাল্লাগে না’ অ্যাস্থেটিক্স পপুলার হতে থাকবে। এ অ্যাস্থেটিক্স খালি বায়বীয় অ্যাস্থেটিক্স না, বাস্তব দুনিয়ায় এ অ্যাস্থেটিক্সের প্রভাব পড়তে থাকবে।  

ওপরে উল্লেখ করা বাংলাদেশি জেন-জি অ্যাস্থেটিক্স কি আমেরিকান জেন-জি এর কপি? মোটা দাগে হ্যাঁ বলা যায়। অবশ্য চিকন দাগে কালচারে কোনো কিছু অন্য কিছুর ফটোকপি হয় না। কিন্তু কপি হলেই বা কী? কপি বা ইমিটেশন তাত্ত্বিক ভাষায় বললে মিমেটিক ডিজায়ার কালচারে সবচেয়ে কমন ও স্বাভাবিক ঘটনা। রেনে জিরার্দ বা তার অনুসারীরা বলবে, এই মিমেটিক ডিজায়ার মানব সমাজের একদম মৌলিক প্রবণতা।  

এটা ঠিক গুলশান, বারিধারা বা উত্তরা যে ছোট সাব-কালচারে এই জেন-জি অ্যাস্থেটিক্সের প্রভাব, সেটি বৃহত্তর বাংলাদেশের সমাজে নগণ্য। সত্যি বলতে, গ্রামাঞ্চল বাদ দেন, ঢাকায় অজস্র সাবকালচার আছে। অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ক্লাস তো আছেই। এমনকি একই অর্থনৈতিক শ্রেণিভুক্ত হয়েও বারিধারা, বনানী, মিরপুর, ভাষানটেক, পুরান ঢাকা, ধানমন্ডির ইয়ুথ কালচারে ব্যাপক ভিন্নতা আছে। প্রতিটা সাবকালচারের আছে নানান ‘লোকাল ফ্যাক্টর’। কিন্তু ব্যবসা, বাজার ও লাইফস্টাইলে প্রভাব রাখা কালচারাল ট্রেন্ডগুলো ডেমোক্রেটিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে না। এক-দুইটা সাবকালচার হেজিমনিক বা প্রভুত্বকারী হয়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো হঠাৎ আসে আর চলে যায়, কিন্তু সেই ঘূর্ণিঝড়ও  নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিত থেকে তৈরি হয়। জেন-জি অ্যাস্থেটিক্সের কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সুপারস্টার সৃষ্টি হলে তো কথাই নাই। তাহলে এই অ্যাস্থেটিক্স, ফ্যাশন বা লাইফস্টাইলের একটা অংশকে প্রভাবিত করবেই। সার্বিকভাবে তার প্রভাব পড়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে।

যা হোক, শুরুর প্রশ্নে ফিরে আসি। কেন জেন-জি গরমকালেও পায়ে মোজা পরে? 

কারণ এটা জেন-জি অ্যাস্থেটিক্সের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টিকটকের অন্যতম পপুলার হ্যাশট্যাগ #ফড়মংড়ঁঃ, জেন-জিদের ক্ষেত্রে, যার অর্থ দৃশ্যমান পায়ের আঙুল। এই হ্যাশট্যাগে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউওয়ালা অসংখ্য ভিডিও আছে। জেন-জি টিকটকারদের ‘ডগ অ্যাটাকস’ ভিডিও পোস্ট করাও কমন। ডগ অ্যাটাকস মানে খালি পায়ে অন্য কারও দ্বারা আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনার পা স্পর্শ করা কিংবা ‘লজ্জাজনকভাবে’ পায়ের আঙুল বা তালু বের করা। আমেরিকা, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশে এ ডগস আউট ট্রেন্ড রমরমা।   

এ ‘ডগস আউট’ ভীতির উৎপত্তির পেছনে আছে একটু অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ‘ডগস আউট’ বা ‘পা উন্মুক্ত’ হয়ে যাওয়াটা আমেরিকায় এত স্পর্শকাতর হইল ক্যামনে? এর মূলে আছে ফুট ফেটিশ। অজস্র ওয়েবসাইট আছে যেখানে কোটি কোটি পায়ের ছবি! বেশিরভাগই ক্রপ করা। মনে করেন, বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ ফটো শেয়ার করলেন। কেউ কেউ সেই ছবি থেকে আপনার পায়ের স্যান্ডেলের ভেতর থেকে বের হয়ে থাকা আঙুলের ছবি ‘ক্রপ’ করে  আপনার নামে প্রফাইল খুলে সেই ছবি আপলোড করে দেবে। যেখানে সেলেব্রিটি থেকে শুরু করে অখ্যাত মানুষের কোটি কোটি পা ও আঙুলের ছবি আছে। 

জেন-জি মানব ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম যারা এমন অদ্ভুত সব সমস্যার ভুক্তভোগী। ফলে জেন-জি তাদের অনলাইন আচরণে হয়ে পড়েছে অসম্ভব ‘প্রাইভেসি প্রোটেক্টেড’ প্রজন্ম। ঠান্ডা আবহাওয়ার পশ্চিমা এক দেশের ফুট ফেটিশের মতো ‘ঘটনা’ গ্রীষ্মমন্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ুর তৃতীয় বিশ্বের এক গরিব দেশের ছেলেমেয়েদের গরমকালেও মোজা পরাচ্ছে ব্যাপারটা মজার না? একে আপনি কালচারের শক্তি বলবেন না প্রভাব সেটা আপনার ব্যাপার।

চটির সঙ্গে মোজা পরার এ কালচার বা মোটাদাগে জেন-জি অ্যাস্থেটিক্স বাংলাদেশে একটা ডমিন্যান্ট সাবকালচার হয়ে উঠবে কিনা সেটা সময় বলবে। কিন্তু নিশ্চিত বিষয় হচ্ছে জেন-জি অ্যাস্থেটিক্স হোক বা অন্য কোনো সাবকালচারের অ্যাস্থেটিক্স হোক, এ রকম কোনো না কোনো সাবকালচারের প্রজন্মই আগামীর দুনিয়া বানাবে। আর তাদের রুচি, অ্যাস্থেটিক্স আর ডমিন্যান্ট কালচারাল ট্রেন্ডও সমাজকে অবধারিতভাবে প্রভাবিত করতে থাকবে। প্রভাব কিছুমাত্রায় পড়াও শুরু হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকলেও, মোটাদাগের একটা উদাহরণ দিয়ে লেখা শেষ করব। আমাদের বাবাদের প্রজন্ম যেখানে ভাবত, ‘এইটুকু রাস্তা হেঁটে গেলেই তো ২০ টাকা সেভ হয়!’ সেখানে আমাদের প্রজন্মের ভাবনা ‘মাত্র ২০ টাকা খরচ করলেই রিকশা করে আরামে যাওয়া যায়!’

একই পরিস্থিতি, অথচ দ্যাখেন, দেখার প্রজন্মগত ভিন্নতা কী ভিন্নরকম দুই রিয়ালিটি হাজির করে!

লেখক : লেখক, অনুবাদক