আভাস ছিল মাঘের শেষেও শ্রাবণের তুমুল বর্ষণের, হলো না। অনেকে মনে করেছিলেন দুকূল উপচানো বানের জল ভাসিয়ে দেবে চরাচর, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোড়ালিও ভেজেনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে খ্রিস্ট-পূর্ব আর খ্রিস্ট-পরবর্তী অধ্যায়ের মতো দুই ভাগ করে দেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালকদের বহুল প্রতীক্ষিত যে বোর্ড সভা, যেখানে তুমুল হট্টগোল হবে ২০২৩ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে, বেরিয়ে আসবে থলের বেড়াল এমনটা যারা ভেবেছিলেন তাদের কল্পনার বেলুন ফুটো হয়ে চুপসে গেছে। চমক বলতে প্রধান নির্বাচক হিসেবে গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নিয়োগ। তিন সংস্করণে এ বছরের জন্য অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। বাকি সবকিছুই সেই থোর বড়ি খাড়া...।
অক্টোবর ৩০, ২০২৩। কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে নৈশভোজ। ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট বোর্ডকর্তারা আমন্ত্রিত। যে ভোজসভাটা হতে পারত আনন্দের, সেটাই চরম নিরানন্দ। কারও মুখে হাসি নেই। কারণ এক দিন আগেই যে ইডেনে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে হেরে গেছে বাংলাদেশ। গোটা বিশ্বকাপ সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলা বিসিবিপ্রধান নাজমুল হোসেন পাপন জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা হবে। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, ২০২৩ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আহ্বায়ক এনায়েত হোসেন সিরাজ আর সদস্য দুজন হলেন মাহবুব আনাম ও আকরাম খান। এ কমিটির সদস্যরা নাভানা টাওয়ারে বিসিবির-পূর্ববর্তী কার্যালয়ে আলাদা আলাদা করে বিশ্বকাপ দলের সব সদস্যকে ডেকেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সবশেষ বিপিএলের সিলেট পর্বে সাকিব আল হাসানের সঙ্গেও কথা বলেছেন। প্রায় তিন মাস ধরে যে প্রতিবেদনটি তারা তৈরি করেছেন এবং গতকাল সোমবার বিসিবির বোর্ড পরিচালকদের নবম সভায় উত্থাপন করেছেন, সেই রিপোর্ট কেউ পড়েই দেখেননি! এ রিপোর্ট আলোর মুখ দেখতে দেখতে নাজমুল হাসান বিসিবি সভাপতি থেকে ক্রীড়ামন্ত্রী হয়ে গেছেন, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর মানুষ তিনি। অথচ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের লজ্জাজনক পারফরম্যান্স, দল নির্বাচনে অব্যবস্থাপনার ছাপ, বিশ্বকাপের আগে সদ্য সাবেক ওয়ানডে অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও সাবেক ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালের পারস্পরিক দোষারোপের ভিডিও এবং ইন্টারভিউ, যা অনেকের মতেই দলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, কোচের হাতে এক ক্রিকেটারের মার খাওয়ার গুঞ্জন... সবকিছু নিয়ে সেই প্রতিবেদনে কিছু আছে কি না, সেসব পড়ে দেখার সময় হয়নি ক্রিকেটের দ-মু-ের কর্তাদের।
কাল বিসিবি কার্যালয়ে বোর্ড সভা শেষে নাজমুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা (কমিটি) প্রতিবেদনটা জমা দিয়েছে। পারফরম্যান্সের ওপর একটা রিপোর্ট আজকে (গতকাল) জমা হয়েছে। ওই রিপোর্টটা বোর্ডের কাছে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু যেহেতু আজকে (বৈঠক) অনেক লম্বা হচ্ছিল, সেজন্য প্রতিবেদনটা আমাকেই দেওয়া হয়েছে দেখার জন্য। আমি দেখার পরে ওখানে কিছু রিকমেন্ডেশনও (সুপারিশ) বলা হয়েছে। তখন এটা দেখে খুব শিগগিরই বোর্ডের সঙ্গে বসে ডিসকাস করে আমরা ঠিক করব কী করণীয় আমাদের। প্রতিবেদনটা দেওয়ার পর সবাই বলেছে যে, এ রিপোর্টটা তো পড়তে হবে। এবং কিছু সুপারিশ আছে সেটাও দেখতে হবে। যেহেতু এটার দায়িত্ব আজকেই আমার কাছে দেওয়া হয়েছে, এখানে বসে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া অনেক কঠিন। সেটা একটু পড়তে হবে, বুঝতে হবে, সবার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আলাপ করে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে। যে সিদ্ধান্তগুলো নিই, ওখানে যা রিকমেন্ডেশন আছে।’
সাবেক অধিনায়ক, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের গভর্নিং বডির সাবেক চেয়ারম্যান ও ক্রিকেট অপারেশনসের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা গাজী আশরাফ হোসেন লিপুকে প্রধান করে নতুন নির্বাচক কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশ করেছেন বিসিবিপ্রধান। গতকাল নাজমুল জানান, ‘নির্বাচক প্যানেল ঠিক করতে আমাদের বৈঠকে অনেক সময় লেগেছে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু বিবেচনা করা আমরা গাজী আশরাফ হোসেন লিপুকে বেছে নিয়েছি। আমাদের কাছে যে নামগুলো এসেছিল তার মধ্যে উনার নামটা ছিল, সেটা দেখার পর আমাদের আর খুব বেশি বাছাই করতে হয়নি। উনি যদি আসতে রাজি হন, হি ইজ দ্য বেস্ট। আমাদের সংশয় ছিল যে, উনি রাজি হবেন কি না। যখন নিশ্চিত হলাম উনি রাজি তখন সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিলাম যে, উনাকেই আমরা প্রধান নির্বাচক করতে যাচ্ছি।’ পূর্ববর্তী নির্বাচক কমিটির কনিষ্ঠতম সদস্য আবদুর রাজ্জাক ঠাঁই পেয়েছেন বর্তমান নির্বাচক কমিটিতেও। বয়সভিত্তিক দলের নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করা হান্নান সরকার এবার জাতীয় দলের নির্বাচক প্যানেলে চলে এসেছেন। তার হাতে বাছাই করা শরিফুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান জয়রা অনূর্ধ্ব-১৯-এর গ-ি পেরিয়ে চলে এসেছেন জাতীয় দলে। পুরস্কারটা দেরিতে হলেও পেলেন হান্নান।
বিসিবির ঘোষিত কেন্দ্রীয় চুক্তিতে সাকিব আছেন তিন সংস্করণেই। তবে সব সংস্করণে সবসময় খেলবেন কি না, সেই নিশ্চয়তা দিতে পারেননি খোদ ক্রীড়ামন্ত্রীও। অবশ্য সাংসদ হয়ে সাকিবের পক্ষে এত কূল তো রক্ষা করাও কঠিন! নাজমুল বলেছেন, ‘সাকিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। তার সঙ্গে কালকে পর্যন্ত যে কথাটা হয়েছে, ওর চোখের সমস্যাটা এখনো যায়নি। আমাদের সামনে শ্রীলঙ্কা সিরিজ আছে, তারপর আরেকটা সিরিজ আছে, বিশ্বকাপ আছে; ওর অ্যাভেইলেবিলিটিটা নিয়ে আমরা শিওর না। ও অবভিয়াসলি আমাদের ফার্স্ট চয়েস, ক্যাপ্টেন হিসেবে সবসময়ই ছিল এবং এখনো আছে। দুর্ভাগ্যবশত যেহেতু একটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা থাকতে চাচ্ছি না। কাজেই আমরা সিদ্ধান্তটা নিতে দেরি করতে চাইনি কারণ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের খুব বেশি সময় নেই। এ সময়টা যেন মসৃণভাবে দলটা চলতে পারে, সেজন্য আমরা নামটা ঘোষণা করে দিয়েছি।’ বিশ্বকাপে এবং পরবর্তী সময়ে দেশে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট সিরিজ এবং নিউজিল্যান্ডে তিন সংস্করণেই শান্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। তাই এটা অনুমিতই ছিল যে, শান্তই পাচ্ছেন দায়িত্ব।
সহকারী কোচদের শূন্য পদে দুজনকে বিসিবি চূড়ান্ত করেছে, এরপর কোচদের সঙ্গে টাকা-পয়সা ও অন্যান্য শর্তে বনলে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বোর্ডপ্রধান। এ ছাড়া ২১ খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের কেন্দ্রীয় চুক্তি, ৮৫ জন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারের কেন্দ্রীয় চুক্তি এসব ২০২৪ সালের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাড়েনি খেলোয়াড়দের বেতন বা ম্যাচ ফি, তবে পারফরম্যান্স অনুযায়ী বাড়বে বোনাস; যেটা নির্ধারিত হবে সিরিজ বাই সিরিজ হিসেবে। বোর্ড সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বিসিবির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী।
বিশ্বকাপের লজ্জাজনক অধ্যায়ের পর কেটে গেছে প্রায় মাস চারেক। নিভে গেছে উত্তেজনার আগুনও। সামনে কড়া নাড়ছে আরেক বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ তদন্ত প্রতিবেদনের মতো এ বিশেষ কমিটির রিপোর্টের ভাগ্যও যে একই রকম হবে, সেটা আন্দাজ করে নেওয়া গেছে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম এবং দীর্ঘসূত্রতা দেখেই। সামনে আরেক বিশ্বকাপ, নতুন অধিনায়ক ও নতুন নির্বাচকদের সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ হবে জুন মাসের পর যেন আরেকটা বিশেষ কমিটি করতে না হয়, সেটা অন্তত নিশ্চিত করা!