হল ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ জাবি প্রশাসন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) হল ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষ সফল নয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি জানিয়েছে। তদন্ত কমিটির পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নোটিস দিয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হয়নি। তাই বিষয়টির কার্যকারিতা শুধু নোটিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ছাড়া যার নামে যে রুম বরাদ্দ সেই কক্ষে অনেক শিক্ষার্থীই থাকেন না। অনেক সময় তারা অন্য হলেও থাকেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের হলের বাইরে অবস্থান করার সময় নির্ধারিত থাকলেও বিষয়টি প্রক্টর বা প্রভোস্ট বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণকা- নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত দলে ছিলেন কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান, উপপরিচালক মৌলি আজাদ ও সহকারী পরিচালক মো. সেহজাদ রিফাত সিয়াম।

কমিটির প্রধান মোহাম্মদ জামিনুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিয়েছি। এখন এর সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হবে এবং তা বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হবে।’ গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ আবাসিক হলের ‘এ’ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে কৌশলে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, তার পরিচিত মামুনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে, যা সারা দেশে আলোচনার জন্ম দেয়। শুধু এ ঘটনায়ই নয়, এর আগেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক ধর্ষণসহ যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মীর মশাররফ হলের ‘এ’ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষটিতে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান অবস্থান করলেও এটি তার নামে বরাদ্দ ছিল না। কক্ষটি অভিযুক্ত মুরাদের নামে বরাদ্দ ছিল। জাবি একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এর হলগুলোতে প্রকৃত আসন সংখ্যার চেয়ে অবস্থানকারী শিক্ষার্থী বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যাওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থী নানা অজুহাতে হলে অবস্থান করে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস বিশাল। যেসব জায়গায় এরকম অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে, সে স্থানগুলো নজরদারির আওতার বাইরে এবং সেসব স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে গেলে পরিবেশবাদীদের কারণে তা সম্ভব হয় না বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯২ জন আনসার সদস্য রয়েছেন। আর হল সংখ্যা ১৯টি। প্রতিটি হলে তিনজন করে নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন।

আরও বলা হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার অনুপাত সমান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ পর্যন্ত যৌন হয়রানির অনেক ঘটনা ঘটলেও নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আশানুরূপ পদক্ষেপ নেয়নি বা গৃহীত পদক্ষেপগুলো কোনো সফলতা নিয়ে আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বহিরাগত ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন ব্যবহার করে। ক্যাম্পাসে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠান হয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আট দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্তদের ন্যূনতম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় হলের আসনসংখ্যার সমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে বহিরাগতদের প্রবেশের যে তিনটি রাস্তা রয়েছে, তা বন্ধ করে বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে।

সুপারিশে আরও বলা হয়, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলো ও সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা উচিত এবং প্রতিটি স্থান নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের অবশ্যই নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। নিয়মিতভাবে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের হলের আসন অবশ্যই বাতিল করে হলে অবস্থান নিষিদ্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছাড়া বহিরাগত কেউ হলের কক্ষে প্রবেশ এবং হলে অবস্থান কার্যকরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।