নতুন নাটকে শাহবাজ প্রধানমন্ত্রী

পাকিস্তানে সরকার গঠনের নাটকীয় ঘটনা নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবারও দেখা যেতে পারে শাহবাজ শরিফকে। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকারে তাকে প্রধানমন্ত্রী ও মরিয়ম নওয়াজকে পাঞ্জাবের মুখমন্ত্রী পদে প্রার্থী করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)। জোট সরকার গঠনের ব্যাপারে পিএমএল-এন ও পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ (পিপিপি) চারটি দল ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

গতকাল রাতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানিয়েছেন পিপিপির কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলি জারদারি। পিএমএল-এনের প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী ও মরিয়মকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী করার বিষয়টি জানিয়েছেন দলের তথ্য সম্পাদক মরিয়ম আওরঙ্গজেব। তিনি বলেন, পিএমএল-এন প্রধান নওয়াজ শরিফ নেপথ্যে থেকে ভাই শাহবাজ ও মেয়ে মরিয়মকে সহযোগিতা দেবেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। প্রধানমন্ত্রী পদে পিএমএল-এন মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানালেও ফেডারেল সরকারের অংশ হতে চায় না তার দল। রাজধানী ইসলামাবাদে দলীয় সভার পর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান তিনি। তবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে তার বাবা আসিফ আলি জারদারিকে দেখতে চান বলেও জানান বিলাওয়াল।

এদিকে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের সমর্থনে সর্বোচ্চ আসনে জয়লাভ করা স্বাধীন প্রার্থীদের নিয়ে নতুন একটি জোট তৈরির চূড়ান্ত নির্দেশনা এসেছে দলটির কারাবন্দি নেতা ইমরান খান। তবে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পিটিআইসহ সব দলকে পুনর্মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন জারদারি। যাতে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার পরিচালনা করা যায়।

পাকিস্তানে গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের পাশাপাশি তিনটি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ফেডারেল সরকার গঠনের আলোচনা এখন পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রে। জাতীয় পরিষদে পিটিআইয়ের সমর্থনে সর্বোচ্চ ৯২ জন স্বাধীন প্রার্থী জয়লাভ করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন পিএমএল-এন ৭৯টি আসন পায় এবং পিপিপি পায় ৫৪টি। গত রবিবার থেকে পিএমএল-এন ও পিপিপি সরকার গঠনের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করে। তাদের সঙ্গে রয়েছে মুত্তাহিদা ক্বওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান (এমকিউএম-পি), যারা জয় পেয়েছে ১৭টি আসনে। জোটের অন্য দল হচ্ছে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-কায়েদ (পিএমএল-কিউ)। এরই মধ্যে পিটিআইয়ের সমর্থনে জেতা প্রার্থীসহ সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াজের দলে যোগ দিয়েছেন।

নওয়াজের দলের সঙ্গে আলোচনা সেরে নেওয়ার পর গতকাল ইসলামাবাদে বৈঠকে বসে পিপিপির কার্যনির্বাহী কমিটি। এরপর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো।

বিলাওয়াল বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থীর তালিকা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করছেন। প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য পিএমএল-এনের প্রার্থীকে সমর্থনের কথা জানিয়ে বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কাছে সরকার গঠন করার যথেষ্ট আসন নেই। এ কারণে নিজেকে প্রধানমন্ত্রিত্বে দাবি থেকে সরিয়ে নিচ্ছি।’ তবে তিনি জানান, পিএমএল-এনের প্রার্থীকে প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন দিলেও তার দল কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ হবে না। দেশের স্থিতিশীলতার জন্যই তার দল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ সময় বিলাওয়াল এও জানান, তিনি তার বাবা আসিফ আলি জারদারিকে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান। তবে বিষয়টি নিয়ে জোটগত কোনো আলোচনায় এসেছে কি না, তা তিনি পরিষ্কার করেননি। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে (আসিফ আলি জারদারির প্রেসিডেন্ট হওয়া) কিছু বলছি না, কারণ তিনি আমার বাবা। আবার এটি বলছি; কারণ দেশে এখন আগুন জ¦লছে। এখন এ আগুন নেভানোর ক্ষমতা যদি কারও থাকে, তিনি হচ্ছেন আসিফ আলি জারদারি।’

বিলাওয়ালের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, পিটিআই-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করে সরকার গড়তে পারেন, তাহলে পিএমএল-এন বিরোধী দলের আসনে বসতে প্রস্তুত।

পিএমএল-এন ও পিপিপির জোট সরকার গড়ার আলোচনার যখন বেশ পরিপক্ব, তখন পিটিআই জানিয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার পাশাপাশি তারা কেন্দ্র ও পাঞ্জাব প্রদেশে সরকার গড়তে পরিকল্পনা করেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন আলি আমিন গান্দাপুর। ইমরান খানের নির্দেশে তিনি ওই পদে বসতে চলেছেন বলে জানিয়েছে পিটিআই।

গতকাল ইসলামাবাদে পিটিআইয়ের মুখপাত্র রউফ হাসান জানান, কেন্দ্র ও পাঞ্জাবে সরকার গঠন করতে তারা মজলিস-ই-ওয়াহদাত-মুসলিমিনের (এমডব্লিউএম) সঙ্গে জোট গড়ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এমডব্লিউএমের সঙ্গে জোট গঠন করার অর্থ হচ্ছে, ইমরানের অনুসারী জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ওই দলে যোগ দিতে পারেন। এরপর সেই হিসেবে আইনসভায় সংরক্ষিত আসনের দাবি করতে পারে এই জোট। পিটিআইয়ের সঙ্গে জোট করা নিয়ে উচ্ছ্বসিত এমডব্লিউএম প্রধান আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস। তিনি জানিয়েছেন, তারা ইমরানের সঙ্গে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও থাকবেন। তিনি আরও বলেন, ‘এটি (এমডব্লিউএম) ইমরান খানেরই দল। তিনি তার দল সম্পর্কে যা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাই হবে। আমরা তা নিঃশর্তভাবে এবং স্বেচ্ছায় গ্রহণ করব।’