সরকার ভোগ্যপণ্যের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে শিগগিরই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করছি। সামষ্টিক অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।’
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তরপর্বে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মুজিবুল হকের প্রশ্নের লিখিত জবাবে তিনি জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও যুদ্ধকেন্দ্রিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকট অনুভূত হচ্ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতি, ভর্তুকি ব্যয়, লেনদেনের ভারসাম্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মুদ্রাবিনিময় হারের ওপর। তবে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের বাজার, গার্মেন্টসের রপ্তানি, ব্যাংকের তারল্য, পণ্যের আমদানি নিরবচ্ছিন্ন রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, টাকা পাচার রোধ, গ্যাস সরবরাহ, টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।
প্রধানমন্ত্রী তার জবাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে ১০টি দেশের সঙ্গে আইনগত সহায়তা চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংসদ নেতা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলোতে ২০২৪ সালে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে আসবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এমন অবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মূল্য কমে আসা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে শিগগিরই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
সরকারি দলের এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় গত ১৫ বছরে ৩৫ লাখ ৮ হাজার পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত গৃহ নির্মাণের মাধ্যমে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাসহ ৮ লাখ ৫২ হাজার ভূমিহীন, গৃহহীন পরিবারের ৪২ লাখ ৩৮ হাজার মানুষকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। মানবিক ও জনবান্ধব এ উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মুহম্মদ সাইফুল ইসলামের প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ববাজারের কয়েকটি পণ্য যেমনশ্ব জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, গম, সারসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ অনূভূত হচ্ছে। সরকার বর্তমানে ভোগ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। উদ্যোগগুলোর কার্যকর প্রভাব অল্প সময়ের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনসাধারণের জীবনযাত্রাকে সহজ করার জন্য সরকারের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং এর ফলে চলমান সাময়িক সংকট কেটে জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবে।
‘নতুন শিক্ষাপদ্ধতিতে মেধাবী জাতি তৈরি হবে’
প্রশ্নোত্তরপর্বে জাসদের সংসদ সদস্য এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনের প্রশ্নের লিখিত জবাবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, নতুন শিক্ষাপদ্ধতিতে মেধাবী একটি জাতি তৈরি হবে বলে তিনি আশা করেন। মন্ত্রী বলেন, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে নতুন পদ্ধতি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার বিষয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘নতুন শিক্ষাব্যবস্থা মূলত নতুন শিক্ষাক্রমের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে, যা আমাদের আগামী প্রজন্মকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, বিশ্বায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরের পথকে সুগম করবে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মশিউর রহমান সজলের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা নেই, তেমন নয়। আগের মুখস্থনির্ভর ও সনদসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য নতুন শিক্ষাব্যবস্থা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হয়েছে, যা প্রচলিত পরীক্ষার ধারণা থেকে ভিন্ন। ফলে আগের মতো মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা না থাকার কারণে অনেকেই নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিই বলে মনে করছেন।
নতুন শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সমন্বয়ে একটি আধুনিক কার্যকর মূল্যায়নপদ্ধতি চালু করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এখানে লিখিত মূল্যায়নের পাশাপাশি সমস্যা সমাধান, একক কাজ, দলীয় কাজের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। উপস্থাপন ও যোগাযোগ সক্ষমতা, সহযোগিতা, নেতৃত্ব, অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণসহ আরও নানা উপায়ে শিখন মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী জানান, সরকার গত ১৫ বছরে ৮২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করেছে। এর মধ্যে ৫৪টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৩৭৪টি কলেজ, ৩৪৭টি স্কুল এবং ৪৯টি কারিগরি।
একই দলের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের প্রশ্নের জবাবে মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, জেএসসি এবং পিইসি সমাপনী পরীক্ষা পুনরায় চালু করার কোনো পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের নেই।