কমেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনে ব্যাপক পার্থক্য। অর্থনীতির অস্থিরতার বছরে বাস্তব অবস্থা চিন্তা না করেই জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনসহ নানা কারণেই অর্থনীতিতে ধীরগতি দেখা দেয়, যা দৃশ্যমান হয়েছে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে। গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার সরকারের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে। কাক্সিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধি না হলেও মূল্যস্ফীতির প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কভিডের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি কমে যাওয়া, দেশের শিল্প ও সেবা খাতের সবচেয়ে উৎপাদন ও কার্যক্রম কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে দেশের প্রবৃদ্ধিতে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত জিডিপির হিসাবে দেখা যায়, দেশের কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেও শিল্প ও সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গত অর্থবছরে কৃষিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) ছিল ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। শিল্প খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, আগের বছরে তা ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরেও ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।

জিডিপির কমার কারণ ব্যাখ্যা করে অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি কমেছে কারণ আমাদের আমদানি সংকুচিত করেছে, উৎপাদনের সঙ্গে যেসব আমদানি সংশ্লিষ্ট ছিল তার ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর প্রভাব তো পড়েছেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিনিয়োগ লভ্যতারও অবনমন ঘটেছে।’

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি যে এক ধরনের নিম্নগামী প্রবণতার মধ্যে ছিল সেটার প্রভাব বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সবকিছুর ওপরই পড়েছে। শুধু কৃষি বাদ দিলে শিল্প ও সেবা খাতসহ সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রিজার্ভের কারণে আমদানি, সুদহারে সংকোচন নীতিও গ্রহণ শুরু হয়েছিল গত বছর থেকেই। আমদানি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের কারণে জিডিপিতে প্রভাব পড়েছে।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জিডিপির পূর্বাভাস কমিয়ে ৫ দশমিক ২ ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ করেছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চঝুঁকি আছে উল্লেখ করে তখন তারা জানিয়েছিল, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো খুব বেশি তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। দেশের ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের উন্নয়নবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, মূল্যস্ফীতির চাপ কমে এলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে। সংস্থাটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উচ্চ দ্রব্যমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।

জিডিপি কমার কারণ হিসেবে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) সিনিয়র অর্থনীতিবিদ হাসনাত আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমার কারণ অনেক কিছুই। কভিড মহামারী থেকে উত্তরণ ঘটা মাত্র রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা একটি সমস্যার জায়গায় গিয়েছিল। পাশাপাশি দেশেও জ¦ালানির দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল তখন। বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবও ছিল, ফলে অনেক দেশেই রপ্তানি কমে গিয়েছিল। সে অর্থবছরে জিডিপি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি একই সময় প্রবাসী আয়ও কমে গিয়েছিল।’

চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে। যেটি আগের বছরের একই প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি কমে যাওয়ার কারণ এখন আরও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ডলারের সংকটও চলছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ডিসেম্বর পর্যন্ত খুব নিচের দিকেই ছিল। সব মিলিয়ে প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

হাসনাত আলম বলেন, ‘আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে কিছুটা বের হলেও এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। শীত শেষে দেশে জ্বালানি সমস্যা আবার দেখা দেবে। প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি সমস্যা কম থাকায় উৎপাদনের ওপর তেমন প্রভাব পড়েনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ যাদের সঙ্গে বাণিজ্য করছে, বিশেষ করে আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বাংলাদেশ যদিও কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। এটা অবশ্যই ভালো পদক্ষেপ। অন্য দেশগুলো এসব পদক্ষেপ আরও অনেক আগে থেকেই নিয়েছিল।

বিবিএস জিডিপির প্রান্তিক হিসাব প্রকাশ করে বলছে, জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা হিসেবে তারা নিয়মিতভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করে থাকে। সরকারের গত ২৬ নভেম্বর, ২০২০ তারিখের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে বিবিএস ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রাক্কলনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বিবিএসও উৎপাদন পদ্ধতিতে ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রাক্কলন করছে। তবে বার্ষিক জিডিপি উৎপাদন ও ব্যয় পদ্ধতিতে প্রাক্কলন ও প্রকাশ করা হয়। ত্রৈমাসিক প্রাক্কলনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির হ্রাস বৃদ্ধির প্রবণতা পরিমাপ করা।

এদিকে বিবিএসের হিসাবে দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬০ টাকা।

মূল্যস্ফীতি ফের ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই : মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। কিন্তু কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। জানুয়ারি মাস শেষে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে ঠেকেছে। যদিও আগের মাস ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। বিবিএসের কনজুমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ আর খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এতদিন কম থাকলেও শহরের মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া। গত মাসে গ্রামের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর শহর এলাকার মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ হওয়ার অর্থ হলো ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে যে পণ্যের দাম ১০০ টাকা ছিল, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ওই একই পণ্য কিনতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৮৬ পয়সায়।

দেশের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়াকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

শীতের মৌসুমেও মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক দুদিকেই আছে। দেশীয় কারণ হলো, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মুদ্রানীতির সংকোচনসহ শিল্পের উৎপাদন কমে যাওয়া।’