ছাত্রলীগের সংঘর্ষে উত্তপ্ত ঢাবি ও চবি ক্যাম্পাস

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সংঘর্ষে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। উভয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্কে আছেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ চান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আগের দুদিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবারও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। এতে পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। ছাত্রলীগের দুটি উপপক্ষ চুজ ফ্রেন্ডস কেয়ারফুলি (সিএফসি) ও সিক্সটি নাইনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান ও ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের অনুসারীদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ নেতাকর্মী আহত হন। গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এর জেরে গতকালও মধুর ক্যান্টিনে দুপক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় মারামারি হয়।

ঢাবির সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রয়েছেন পলাশ রায় সৌরভ, অপূর্ব চক্রবর্তী, পল্লব মণ্ডল, অর্পণ কুমার বাপ্পি, বিপ্লব পাল, বর্ষণ রায় ও কার্তিক কুমার। তারা প্রত্যেকেই সৈকতের অনুসারী বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ইনানের অনুসারীদের মধ্যে আহত হয়েছেন অভিষেক ভাদুড়ি, জয় দাস, অপূর্ব, ধ্রুব, চিন্ময়, রিদ্ধি, অভি ও প্রীতম।

জানা গেছে, সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত কনসার্ট শেষে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত চলে যাওয়ার সময় হল কমিটির পদপ্রার্থী ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের অনুসারী গণেশ ঘোষের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। গণেশ সৈকতের কাছে ক্ষমা চাইলে আপাতত ওই ঘটনা শেষ হয়। তবে সৈকত চলে যাওয়ার পরপরই হল মাঠে ইনান ও সৈকতের অনুসারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়, যা রাত ৪টা পর্যন্ত চলে। এ সময় উভয়পক্ষের কর্মীদের হাতে হকিস্টিক ও জিআই পাইপসহ ধারালো অস্ত্র দেখা যায়। এ ঘটনায় সৈকতের অনুসারী অপূর্ব চক্রবর্তীর মাথা ফেটে যায়। এ ছাড়া আরও ১৩ জন আহত হন। পরে ঘটনাস্থলে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা ও জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সভাপতি অনতু বর্মণ এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিয়ে হলে ফেরেন। কিন্তু অপূর্বর মাথা ফেটে যাওয়ায় সেখানে আটটি সেলাই দেওয়া হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার প্রতিকার চাইতে গতকাল বিকেলে তানভীর হাসান সৈকতের অনুসারীরা শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের কাছে এলে দুপক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তা ফের মারামারিতে রূপ নেয়। এতে আরও বেশ কয়েকজন আহত হন। এ সময় শেখ ইনান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ‘জগন্নাথ হলে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের সঙ্গে আমার অনুসারীদের একটা ঝামেলা হয়। এ ঘটনার জন্য মধুর ক্যান্টিনে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের কাছে আমার কর্মীরা বিচার দিতে গেলে তার সমর্থকরা আবারও পলাশ ও অপূর্বসহ কয়েকজনকে মেরেছে। আগের রাতেও ওদের ওপর হামলা করেছিল। এ বিষয়ে আমরা বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’

ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, ‘জগন্নাথ হলে একটা ঝামেলা হয়েছে শুনেছি। সেটা নিয়েই মধুর ক্যান্টিনে ছোটখাটো ঝামেলা হয়েছে। সেখানে আমার ও সৈকতের অনুসারীরা ছিল। ঘটনা আমরা খতিয়ে দেখব এবং কে অপরাধী তা শনাক্ত করব। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চবিতে তৃতীয় দিনের সংঘর্ষে আহত ১৫: চবি শাখা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা গতকাল বিকেল ৪টার দিকে ফের সংঘর্ষে জড়ান। এর আগে বৃহস্পতিবার দিন ও রাতে কয়েক দফায় তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হয়েছিলেন অন্তত ২৫ জন। তার আগে বুধবারও সংঘর্ষ হয় তাদের মধ্যে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনায় গতকাল সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। জুমার পর সিএফসি ও সিক্সটি নাইনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমে সংঘর্ষ শুরু হয়। দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের পর পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডির সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আসে। উভয়পক্ষকে হলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর শহীদ আবদুর রব হলে অবস্থান করা সিএফসি গ্রুপের আরেকটি পক্ষ এসে সিক্সটি নাইনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এর জেরে আবারও সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় ছাত্রলীগের বিজয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা সোহরাওয়ার্দী মোড়ে এবং সিক্সটি নাইন গ্রুপের নেতাকর্মীরা শাহজালাল হলের সামনে অবস্থান নেন। পরে উভয় গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীদের ধারালো অস্ত্রের মহড়া দিতে দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. আবু তৈয়ব জানান, সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত হয়েছে অন্তত ১৫ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, আহত হয়েছে অন্তত অর্ধশতাধিক।

এ ব্যাপারে চবির প্রক্টর ড. নূরুল আজিম সিকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিকেল থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেছি।’

হাটহাজারী থানার এসআই মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘শুরুতে অল্পসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হলেও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।’

সিএফসি শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী এবং সিক্সটি নাইন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত।