‘শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতির গল্পে ভরপুর, একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনার রঙ’ কবি শামসুর রাহমানের কবিতার পঙ্্ক্তির মতো বছর পেরিয়ে প্রকৃতিতে ফাগুন এসেছে। পথের ধারে সজ্জিত কৃষ্ণচূড়ার লাল, বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে বেদনাবিধুর স্মৃতি আর সংগ্রামী চেতনার অমীয় ধারা বহন করে চলা অমর একুশে ফেব্রুয়ারির কথা।
ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস। এই মাসটা এলেই যেন আমরা বাংলা ভাষার প্রতি লুকানো ভালোবাসা খুঁজে ফিরি, সন্ধান করি শেকড়ের। মনে পড়ে ভাষার জন্য শহীদদের আত্মত্যাগের কথা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ভাষার জন্য আন্দোলন বা চেতনা লালন কি শুধুই বিশেষ একটি দিবস বা মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বাংলা ভাষাকে নিয়ে প্রচন্ড গৌরব করা অতুল প্রসাদ সেনের পরবর্তী প্রজন্ম কেন আজ বাংলা বলতে হীনম্মন্যতায় ভোগে? রক্ত দিয়ে ভাষা কিনে আনা একমাত্র জাতি আর ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান এসব বড়াই এখন কেবল ফেসবুক আর ভাষণেই। বাস্তবতা হলো, বাংলার প্রকৃত মর্যাদা রক্ষায় যে শুদ্ধ পরিচর্যার প্রয়োজন, তার বড্ড অভাব। অপসংস্কৃতি আর তথাকথিত আধুনিকতার আগ্রাসনে বিকৃত হতে হতে বাংলা ভাষা আজ সাগরের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। বাংলা ভাষার প্রাণ ফেরাতে করতে হবে সঠিক পরিচর্যা। সে ক্ষেত্রে বড় একটি নিয়ামক হতে পারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আগামীর দেশ গড়ার কারিগর। তাদের হাত ধরেই সূচিত হতে পারে বিপ্লব। ইতিহাস অন্তত সেই কথাই বলে। দেশের স্বাধিকার লড়াইয়ের প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামের বীজ বোনা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকেই। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্যের প্রথম তীব্র প্রতিবাদ জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। তমুদ্দীন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ প্রভূতি সংগঠন ছাত্ররাই গড়ে তোলে। এমনকি ভাষাশহীদদের মধ্যে বরকত, রফিক আর শফিউর ছিলেন ছাত্র।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য অকুতোভয় ছাত্রসমাজ রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করেছে। তাদের দেখানো পথ ধরে মাটিতে লুটোপুটি খাওয়া বাংলা ভাষার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে আবারও এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের। প্রতিটি শিক্ষায়তন হতে হবে শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চার দিক দিয়ে শিক্ষায়তনগুলো অনেক বেশি উদাসীন। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের মাধ্যম ইংরেজি। উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষা প্রবর্তনের দাবি মাঝেমধ্যে দু-একবার উচ্চারিত হলেও কখনোই জোরালো হয়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি জানানো সংগঠনগুলোও ফেব্রুয়ারি ছাড়া সারা বছর নিষ্প্রভ। শিক্ষায়তনের ভাষা শিক্ষার বিশেষ কোনো সংগঠনগুলো নামও ইংরেজিতে। অথচ মাতৃভাষা যে মাতৃদুগ্ধের মতো।
তাই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আর তথাকথিত আধুনিকতার স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে আমাদের বাংলাকে ধরে রাখতে হবে। শিক্ষায়তনে শুরু করতে হবে সুস্থ সংস্কৃতি লালনের অভ্যাস। যে কোনো দাপ্তরিক চিঠিপত্র, নির্দেশিকা, প্রজ্ঞাপন, আবেদনপত্রসহ সব ক্ষেত্রে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভিনদেশি ভাষার গান বাজানোর প্রবণতা থেকে। চায়ের কাপের আড্ডায়, শ্রেণিকক্ষের বাইরে কোনো সভা-সমাবেশ কিংবা প্রিয়জনকে মনের কথা জানানোর বহিঃপ্রকাশে হোক শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা। জগাখিচুড়ি মিশ্রিত, বিকৃত আর অশ্রাব্য ভাষা কলুষিত করছে আমাদের মস্তিষ্ককেও। অথচ শিক্ষায়তনের শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ভাষার সঠিক পরিচর্যার জন্য প্রয়োজন শুধু একটুখানি আন্তরিকতা। শিক্ষায়তনগুলো হোক না সমুদ্রপথের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতের আশার প্রদীপ, হোক বাংলার দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা।
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ